tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কাল, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কাল, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে ভোটকে বিবেচনা করা হয়।

বর্তমানে হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রিপাবলিকানদের হাতে। অন্যদিকে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য আবারও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। বিপরীতে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছে রিপাবলিকানরা।

যেসব আসনে ভোট হচ্ছে

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন করবেন ভোটাররা।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের মেয়াদ দুই বছর। অন্যদিকে সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি ১০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারির ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদের আসন পুনর্বণ্টন করা হয়। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ৫২টি আসন। অন্যদিকে ওয়াইয়োমিং ও ভারমন্টের মতো কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্যগুলোতে রয়েছে একটি করে আসন।

প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি আগে রিপাবলিকান এবং অন্যটি ডেমোক্র্যাট সদস্যের দখলে ছিল। নির্বাচনে বিজয়ী নতুন প্রতিনিধিরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেবেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধের প্রভাব

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, দেশটি যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের সময়ও ক্রমেই কমে আসছে। এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর আগামী দুই বছরে আইন প্রণয়ন, সরকারের নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে।

নির্বাচনে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ নির্বাচনী বিরোধে সরাসরি হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সুবিধার্থে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন ধারণা এড়াতে নির্বাচনী বিষয়ে বিচার বিভাগ সতর্ক অবস্থান বজায় রাখে। তবে এবার ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কায় নির্বাচনী বিরোধে বিচার বিভাগের পদক্ষেপ সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকযোগে পাঠানো প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদন করেছিল বিচার বিভাগ। তাদের অভিযোগ, এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এবং আইন অনুযায়ী তাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এ ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিও চাওয়া হয়েছে।

তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যালট আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের আইনগত ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যটি। শেষ পর্যন্ত আদালত বিচার বিভাগের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

আলাস্কাতেও একই ধরনের আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের সঙ্গে একই নামের আরেকজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বিচার বিভাগের অভিযোগ, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই ওই প্রার্থীকে নির্বাচনে আনা হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল জে. সুলিভানকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে পেলটোলার প্রচারশিবির এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, দুই সুলিভানের কারও প্রচারশিবিরের সঙ্গেই তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই আলাস্কা নিয়ে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মামলায় বলা হয়েছিল, ভোটের ব্যবধান কম হলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার সম্ভাবনা তদন্ত করতে হবে এবং ফলাফলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা প্রত্যয়ন স্থগিত রাখতে হবে।

তবে আলাস্কার ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন রোববার মামলাটি খারিজ করে দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ভোটের গোপনীয়তা বজায় রেখে এ ধরনের তদন্ত পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বিচার বিভাগ।

সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের এসব পদক্ষেপ ব্যবহার করা হতে পারে। এতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২০ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা

এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ট্রাম্প ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে স্বাধীন গবেষণা ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিরীক্ষায় ভোট জালিয়াতির ঘটনা বিরল বলে উঠে এসেছে। ওই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্পের সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন ৬০টির বেশি মামলা করেছিল। তবে সেগুলোর কোনোটিতেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও নির্বাচনের ফল নিয়ে এসব প্রচেষ্টায় বিভাগকে যুক্ত করার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঙ্গরাজ্যগুলো অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, দেশটির নাগরিক নন—এমন ব্যক্তিদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ

ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তারাও। নির্বাচনী আইন ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত হুমকি মোকাবিলায় বিচার বিভাগের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দেওয়া মার্ক ব্লুমবার্গ বলেছেন, প্রশাসন বিচার বিভাগকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চাইছে, যা আগে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা পিটার কেইসলারও সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিরোধে বিচার বিভাগ কোনো পক্ষ নিচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হলে আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ দাবি করেছেন, বিচার বিভাগের পদক্ষেপ আইনসম্মত এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে। বিভাগের মুখপাত্র কিয়েরস্টেন পেলসও বলেছেন, কোনো নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে সহায়তা করা হচ্ছে না; বরং আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

নির্বাচনী তদন্তের নীতিতেও পরিবর্তন

বিচার বিভাগের নির্বাচনী তদন্ত পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আগে নির্বাচনী আইন নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পাবলিক ইন্টিগ্রিটি বিভাগের পরামর্শ নেওয়া হতো। নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়নের আগে তদন্তে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শও দিতেন তাঁরা।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই বিভাগের জনবল কমিয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী দুর্নীতির তদন্তে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ওই বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নিষ্পত্তি করবেন। এ ক্ষেত্রে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় মধ্যস্থতা করবে।

সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচনী তদন্তে এই কার্যালয়ের সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। তবে বিচার বিভাগের মুখপাত্রের বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে কোনো বিরোধের সমাধান না হলে তা নিষ্পত্তি করাই ওই কার্যালয়ের দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসন দখলের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আগামী দিনের কার্যক্রম। নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছরে আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।