অনেক বাবা-মায়েরই একমাত্র সন্তান যদি মেয়ে হয়, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়তি চিন্তা থাকে। মেয়ের নিরাপত্তা ও আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে কেউ কেউ জীবিত থাকতেই নিজের সম্পত্তির পুরোটাই তার নামে লিখে দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তে হেবা বা দান এবং মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া উত্তরাধিকার—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
প্রশ্ন হলো, একজন বাবা কি জীবিত অবস্থায় তার একমাত্র মেয়েকে নিজের সব সম্পত্তি দিয়ে দিতে পারেন? আর এভাবে সম্পদ হস্তান্তর করলে মৃত্যুর পরও কি মেয়ে পুরো সম্পত্তির মালিক থাকবেন?
জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হেবা করার বিধান
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের বৈধ মালিকানাধীন সম্পদের ওপর পূর্ণ অধিকার রাখেন। ফলে তিনি চাইলে জীবিত থাকতেই নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে হেবা বা দান করতে পারেন।
সুতরাং কোনো বাবা যদি জীবিত অবস্থায় তার একমাত্র মেয়েকে সম্পত্তি দান করেন এবং শরিয়তসম্মতভাবে সেই সম্পত্তির দখল বা কবজা মেয়ের কাছে হস্তান্তর করে দেন, তাহলে হেবাটি কার্যকর হবে। সেক্ষেত্রে বাবা জীবিত থাকা অবস্থাতেই মেয়ে ওই সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবেন এবং বাবার মৃত্যুর পর সেটি আর মিরাসের সম্পত্তির অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।
আসল বিষয় নির্ভর করে নিয়তের ওপর
তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিয়ত বা উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, প্রয়োজন বা স্নেহের কারণে সম্পদ দেওয়ার বিষয়টি এক রকম; আর অন্য সম্ভাব্য ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি সরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কোনো বাবা যদি মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে এবং কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য ছাড়া জীবিত অবস্থায় তাকে সম্পত্তি দেন, তাহলে তা শরিয়তসম্মত হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি উদ্দেশ্য হয়—মৃত্যুর পর যারা শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হবেন, তাদের প্রাপ্য অংশ যেন তারা না পান—তাহলে এমন উদ্দেশ্য নিন্দনীয় এবং গুনাহের কারণ হতে পারে।
পবিত্র কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান উল্লেখ করার সময় অন্য উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ ۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ
‘এ সবই পালিত হবে মৃতের কৃত ওসিয়ত পূরণ বা ঋণ পরিশোধের পর—যদি তা কারও জন্য ক্ষতিকর না হয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত নির্দেশ।’
—সুরা আন-নিসা: ১২
এ ছাড়া উত্তরাধিকারীর অধিকার নষ্ট করার ব্যাপারে হাদিসেও কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ قَطَعَ اللَّهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের উত্তরাধিকার বা প্রাপ্য অংশ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবে (বা তা বঞ্চিত করবে), কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার উত্তরাধিকার কেটে দেবেন।’
—ইবনে মাজাহ: ২৭০৩
ফিকহের দৃষ্টিতে কী বলা হয়েছে?
সন্তানদের মধ্যে সম্পদ দেওয়ার বিষয়ে আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে—
وَفِي الْهِنْدِيَّةِ: لاَ بَأْسَ بِهِ إِذَا لَمْ يُقْصِدْ بِهِ الإِضْرَارَ، وَإِنْ قَصَدَ بِهِ الإِضْرَارَ سَوَّى بَيْنَهُمْ، وَهُوَ الْمُخْتَارُ
এর অর্থ হলো, কাউকে সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য না থাকলে এতে অসুবিধা নেই। তবে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য থাকলে সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখার মতটি গ্রহণযোগ্য।
অর্থাৎ, একমাত্র মেয়েকে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দেওয়ার বিষয়টি শুধু ‘মিরাসে মেয়ের অংশ কত’—এই প্রশ্ন দিয়ে বিচার করা যাবে না। জীবিত অবস্থায় করা হেবা এবং মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া উত্তরাধিকার আইন এক বিষয় নয়।
তাহলে কী করা উচিত?
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার চিন্তা স্বাভাবিক। তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় শরিয়তের বিধান, অন্যান্য সম্ভাব্য ওয়ারিশের অধিকার এবং নিজের নিয়ত—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে বড় ধরনের সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তরের আগে স্থানীয়ভাবে নির্ভরযোগ্য আলেম বা ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ হেবা বৈধ হওয়ার জন্য শুধু কাগজে নাম লিখে দেওয়া যথেষ্ট কি না, দখল হস্তান্তর হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃতি কী—এসব বিষয়ও ফিকহি বিধানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর নির্ধারিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পদ হস্তান্তর না করা। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পাশাপাশি আত্মীয়দের অধিকার এবং পরকালের জবাবদিহিতার বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা উচিত।



