বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকা করলে সবার ওপরের দিকেই থাকবে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে ও আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম। মাঠের অসাধারণ নৈপুণ্য, দলীয় সাফল্য আর কোটি ভক্তের ভালোবাসায় তাঁরা দুজনই ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। অথচ এত অর্জন ও খ্যাতির পরও তাঁদের কারও হাতেই ওঠেনি ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। তবে এর কারণ কি তাঁদের পারফরম্যান্সের ঘাটতি? মোটেও নয়। মূলত পুরস্কারটির তৎকালীন যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়মই তাঁদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত ব্যালন ডি’অর পুরস্কার শুরুর দিকে কেবল ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য নির্ধারিত ছিল। ফলে ইউরোপের বাইরে জন্ম নেওয়া পেলে ও ম্যারাডোনার মতো বিশ্বসেরা তারকারা নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পাননি। তাঁদের অসাধারণ কীর্তিও তখনকার নিয়মের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেনি।
১৯৯৫ সালে বদলায় নিয়ম
ব্যালন ডি’অরের যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়মে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৫ সালে। ওই বছর থেকে ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান। সেই বছরই প্রথম অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অর জেতেন লাইবেরিয়ার তারকা স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহ। তখন তিনি ইতালির ক্লাব এসি মিলানের হয়ে খেলছিলেন।
পরবর্তী সময়ে এই নিয়মের আওতায় ব্যালন ডি’অর জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকা। এর মধ্য দিয়ে পুরস্কারটি ইউরোপের বাইরের প্রতিভাবান ফুটবলারদের জন্যও উন্মুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করে।
২০০৭ সালে সবার জন্য উন্মুক্ত হয় ব্যালন ডি’অর
২০০৭ সালে ব্যালন ডি’অরের নিয়মে আরও বড় পরিবর্তন আনা হয়। এরপর থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের যেকোনো ক্লাবে খেলা ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান। ফলে ইউরোপের ক্লাবে খেলার বাধ্যবাধকতাও আর থাকেনি।
এই পরিবর্তনের সুবিধা পেয়েছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মিয়ামিতে খেলার সময়ও তিনি ব্যালন ডি’অর জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন। অর্থাৎ, পুরস্কারটির যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়ম সময়ের সঙ্গে বদলেছে এবং তা আরও আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে।
পেলের ক্যারিয়ারে নিয়মের বাধা
ব্রাজিলকে তিনবার বিশ্বকাপ জেতানো পেলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড়। তাঁর অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা, মাঠের দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের বড় অংশজুড়েই ব্যালন ডি’অর ছিল কেবল ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য।
পেলে ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে খেলার মধ্য দিয়ে পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। অথচ ইউরোপের বাইরের ক্লাবে খেলা ফুটবলারদের জন্য পুরস্কারটির দরজা পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বহু আগেই শেষ হয় তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। ফলে প্রতিভা ও অর্জনে অনন্য হয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যালন ডি’অর জয়ের সুযোগ পাননি তিনি।
ম্যারাডোনার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা
আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জেতানো দিয়েগো ম্যারাডোনাও ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তাঁর ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়ার দক্ষতা ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বার্সেলোনা, নাপোলি ও সেভিয়ার মতো ইউরোপীয় ক্লাবেও খেলেছেন তিনি।
তবু ইউরোপের ক্লাবে খেললেও ম্যারাডোনা ব্যালন ডি’অরের জন্য যোগ্য ছিলেন না। কারণ, তাঁর সময়েও পুরস্কারটি ইউরোপীয় নাগরিকত্বের শর্তে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনায় ফিরে যাওয়ার আগপর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেললেও সেই নিয়মের কারণে পুরস্কারটি জয়ের সুযোগ তৈরি হয়নি।
এ ছাড়া ১৯৯১ সালে মাদক পরীক্ষায় কোকেন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। তবে তাঁর ব্যালন ডি’অর না জেতার মৌলিক কারণ ছিল পুরস্কারটির তৎকালীন যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়ম।
যোগ্যতার নিয়ম বদলালে কি বদলাত ইতিহাস?
পেলে ও ম্যারাডোনার ব্যালন ডি’অর না জেতার ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তাঁদের অসাধারণ পারফরম্যান্স, বিশ্বকাপজয়ী সাফল্য ও খেলাটিতে গভীর প্রভাব বিবেচনায় অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে—তাঁদের সময়ে নিয়ম ভিন্ন হলে কি তাঁরা এই পুরস্কার জিততে পারতেন?
নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, কারণ ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের পারফরম্যান্স, ভোটারদের মূল্যায়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটুকু স্পষ্ট, তৎকালীন নিয়ম তাঁদের পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগই দেয়নি।
ফুটবলের ইতিহাসে তাই পেলে ও ম্যারাডোনার ব্যালন ডি’অর না জেতা তাঁদের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ নয়; বরং পুরস্কারটির একসময়ের সংকীর্ণ যোগ্যতা কাঠামোর প্রতিফলন। নিয়মের বেড়াজাল না থাকলে তাঁদের অর্জনের তালিকায় ব্যালন ডি’অরের নাম যুক্ত হতো কি না, তা অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই থাকবে। তবে একটি বিষয়ে সন্দেহ নেই—ব্যালন ডি’অর জিতুন বা না জিতুন, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে পেলে ও ম্যারাডোনার অবস্থান চিরকালই অনন্য।



