যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরুর আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প—এমন উদ্বেগের মধ্যে দুই দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে কাতার। এর অংশ হিসেবে শুক্রবার ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে দেশটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানির একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি তেহরানে গেছে। সেখানে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
এর আগে বুধবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা পুনরায় শুরু করতে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বৃহস্পতিবার আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও জানান, তেহরান এখনো এর কোনো জবাব দেয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে রেজায়ির কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আলোচনার শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচ্যসূচিতে রাখার কথা বলা হয়েছে। নতুন করে সামরিক হামলা এড়ানোই এই কূটনৈতিক উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
গত এক সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরান থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে আট মাস ধরে চলা সংঘাত আবারও পূর্ণমাত্রার সামরিক যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তির পথ তৈরি হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলার বিভিন্ন সামরিক বিকল্প নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেছেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও গোলাবারুদের মজুত বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সামরিক কার্গো বিমান ইসরাইলের নেগেভ অঞ্চলের ওভদা ও নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে। এ ছাড়া জর্ডান, সৌদি আরব ও কাতারেও অতিরিক্ত সামরিক বিমান পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মারফি জানিয়েছেন, তাঁকে এসব সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। পরিকল্পনাগুলোকে ‘উন্মাদনাপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই এই সংঘাতকে ‘শেষ না হওয়া যুদ্ধে’ পরিণত হতে দেবেন না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের অনাস্থা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ওপর আর আস্থা রাখতে পারছে না তাঁর দেশ। কারণ, অতীতেও আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, অতীতের একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তাঁর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ধরনের হামলায় অতীতে দেখা যায়নি, এমন যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি, তেহরানের অনাস্থা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার স্থবিরতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কাতারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের তেহরান সফর নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দুই দেশ আলোচনায় ফিরতে পারে কি না, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখে পড়ে।



