ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানলের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় বায়ুদূষণ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দাবানল থেকে ছড়িয়ে পড়া ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত কণায় ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপরও বাড়ছে চাপ।
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও কালিমান্তান অঞ্চলে কৃষি ও বাগানের জমি তৈরির জন্য বিভিন্ন সময়ে আগুন লাগানোর পাশাপাশি শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র খরা ও প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি আগুন নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাতাসে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা ছড়িয়ে পড়ছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া আকাশপথে পানি ছিটানো ও কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কাজে ৫০টির বেশি বিমান ব্যবহারের কথা জানা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানও হেলিকপ্টার পাঠিয়ে সহায়তা করছে। বায়ুদূষণ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন এলাকায় জননিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অনেক স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়ায় থাকা অতিক্ষুদ্র পিএম২.৫ কণা শ্বাসের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতে পারে। স্বল্পমেয়াদে এই দূষণের সংস্পর্শে চোখ জ্বালাপোড়া, কাশি, গলা ও নাকের অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে হৃদ্রোগ ও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই হাঁপানি বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। একই সঙ্গে দাবানল ও ধোঁয়ার প্রভাবে গৃহপালিত পশুপাখিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। ফলে দাবানল এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর মতো জলবায়ুগত প্রভাবের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও উচ্চ তাপমাত্রা যুক্ত হলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু বন ও পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তীব্র খরার কারণে ইন্দোনেশিয়ায় পাম তেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও খরা ও চরম আবহাওয়ার কারণে ধান, আখসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে খাদ্য সরবরাহ ও বাজারদামের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, দাবানল, খরা ও বায়ুদূষণের মতো পরস্পরসম্পর্কিত সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, বন ব্যবস্থাপনা এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে দূষিত এলাকায় স্বাস্থ্য সতর্কতা, স্কুল ও কর্মস্থল পরিচালনা এবং জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।



