ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। এতে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র রোগী স্থানান্তর করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতাল চত্বরে পার্কিং সুবিধার দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হলেও, এর নেপথ্যে অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা পুনরায় চালুর চেষ্টা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ২ নম্বর ভবনের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেকেই বিকল্প পরিবহন না পেয়ে বিপাকে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু থাকাকালে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি চক্র বিপুল অর্থ আয় করত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
জরুরি বিভাগের সামনে বোনকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় ছিলেন রেজাউল করিম। তার বোন সীমা আক্তার মঙ্গলবার মাওয়া রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
রেজাউল করিম বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) মাওয়া রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আমার বোন। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন এখানকার চিকিৎসকরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে ২-৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে পারিনি। ৯৯৯-এ কল করেছিলাম। তবুও পাইনি। শেষে জরুরি বিভাগের সামনে থাকা ঢাকা মেডিকেলের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সচালক আমাদের বলেন, তিনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারবেন। এরপর সেই গাড়িতে করেই এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি।’
সাভার থেকে আসা ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী শাহীন গাজীকে জরুরি বিভাগের সিঁড়ির ওপর ট্রলিতে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। তার ছোট ভাই শামীম গাজী বলেন, ‘এমআরআই করার জন্য লালবাগ ইবনে সিনা হাসপাতালে যেতে হবে। তবে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে পাচ্ছি না।’
রোগীদের জিম্মি করে আন্দোলনের অভিযোগ
শফিক আহমেদ নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবায় একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। তার ভাষ্য, ধর্মঘটের কারণে রোগীদের অন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘পুরো হাসপাতালটিই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে। অ্যাম্বুলেন্সও তার বাইরে না। এখানে বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসব রোগী নিয়ে যেতে, সেটিও করতে পারছি না। এখানকার চালকেরা বাধা দিচ্ছে। রোগীদের জিম্মি করে তারা আন্দোলন করছে। সরকারের উচিত, তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।’
অ্যাপভিত্তিক সেবা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ধর্মঘটের কারণ ও অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, হাসপাতালের সাবেক পরিচালক রোগীদের সুবিধার্থে অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করেছিলেন। তবে তার অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে মালিক সমিতির একটি অংশ ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি চক্রের প্রভাবে অ্যাপটিতে ভাড়ার হার বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘এক হাজার টাকার ভাড়া অ্যাপের দোহাই দিয়ে আদায় করা হতো আড়াই হাজার টাকা। আর আট হাজার টাকার ভাড়া আদায় করা হতো ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা।’
ওই ব্যক্তির দাবি, অ্যাপভিত্তিক সেবা থেকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা কমিশন পেত। সে হিসাবে মাসে কমিশনের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। হাসপাতালে নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর অ্যাপভিত্তিক সেবাটি বন্ধ করে দেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আরেক অ্যাম্বুলেন্স মালিকের অভিযোগ, হাসপাতাল চত্বরে পার্কিংয়ের দাবিটি মূলত অ্যাপভিত্তিক সেবা পুনরায় চালুর কৌশল। তার ভাষ্য, হাসপাতালের ভেতরে পার্কিংয়ের সুযোগ পেলে পরবর্তী সময়ে ওই সেবা আবার চালু করার চেষ্টা করা হতে পারে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে দাবির বিরোধিতাকারী কিছু অ্যাম্বুলেন্স মালিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সেবা দিতে পারছেন না। ধর্মঘটের ব্যয়ও অ্যাপসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বহন করছেন বলে দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ধর্মঘট আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্মঘটের পেছনে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির দুই নেতার ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকেন্দ্রিক যুবদলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশী বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইমন আলী ধর্মঘট অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট চলমান রয়েছে। আজকে যদি আমাদের দাবি মেনে না নেয়, তবে আগামীকাল থেকে ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্সের মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হবে।’
ধর্মঘটের কারণে জরুরি ভিত্তিতে রোগী স্থানান্তর ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অন্য হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।



