সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সারা দেশে। দীর্ঘ কারাবাস ও নানা জটিল রোগে ভোগার পর তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছেন। জনসমক্ষে তাঁর সর্বশেষ উচ্চারিত বাক্য ছিল—
‘দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিস্ট ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি।’
বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এভাবেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আরেক নারী নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার পালাবদল দেশের রাজনৈতিক ভাগ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পাঁচ দশকের ইতিহাস বারবার সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। এমনই এক সামরিক শাসকের স্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি দুই দফায় পূর্ণ মেয়াদ এবং এক দফায় স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত তিন দশকের বেশি সময় তিনি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার রাজনীতিতে শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
জীবনের শেষ এক দশক খালেদা জিয়া কাটিয়েছেন অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যে। শেখ হাসিনার শাসনামলে কখনো কারাগারে, কখনো গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই তাঁকে বারবার হাসপাতালে নেওয়া-আনা করা হতো। বয়সজনিত জটিলতার পাশাপাশি তিনি বাতজ্বর, ডায়াবেটিস ও গুরুতর লিভার রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২১ সালে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
চিকিৎসকদের বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার ও আদালতের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি বিদেশে যেতে পারেননি। সে সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, বিদেশি চিকিৎসক বাংলাদেশে এনে চিকিৎসা করানো যেতে পারে, তবে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর খালেদা জিয়া গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পান এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা প্রায় এক ডজন মামলা খারিজ হয়। তবে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও বিএনপি তাঁকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। সেই নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
হাসপাতালের শয্যা থেকেই তিনি শেখ হাসিনার পতনকে ‘স্বৈরাচারের অবসান’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন—
‘দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিস্ট ও অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি।’
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ বা ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ শাসিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির দিনাজপুর জেলায়। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ষাটের দশকে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুত বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৯১ সালে তিনি নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট করে তিনি আবার ক্ষমতায় ফেরেন। তবে ওই মেয়াদে উগ্রবাদ ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে।
২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি মামলা হয়। ২০১৮ সালে এতিমখানা তহবিল দুর্নীতি মামলায় তাঁকে দণ্ড দেওয়া হয়। এসব মামলার মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজনীতিতে রয়েছেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর তিনি চলতি বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান ২০১৫ সালে ইন্তেকাল করেন।



