কুমিল্লা ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। নির্ধারিত সময়ে সিরিয়াল নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। অনেক ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের সহকারীদের বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও উঠেছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সরেজমিনে হাসপাতালটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় গিয়ে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। বিকেল ৩টা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসকদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়।
হাসপাতালের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আজিজুল হোসাইনের চেম্বারের সামনে শতাধিক রোগী অপেক্ষা করছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে শিশুরা কান্নাকাটি করলেও চিকিৎসকের দেখা মিলছিল না। পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের উপস্থিতি না থাকা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণ জানতে চাইলে তাঁর সহযোগী আব্দুল মান্নান রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া থেকে আসা এক নবজাতকের মা আয়েশা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাকে বিকেল ৪টায় আসতে বলা হয়েছিল। অথচ রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পাইনি। একটি নবজাতককে নিয়ে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করা কতটা কষ্টের, তা তাঁরা বোঝেন না। বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ করায় সহকারী আব্দুল মান্নান আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।’
একই চিকিৎসকের কাছে আসা এমদাদুল হক নামের আরেক অভিভাবক জানান, জ্বর ও নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে আট মাস বয়সী শিশুকন্যাকে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত সিরিয়ালের বাইরে অর্থের বিনিময়ে কিংবা বিশেষ বিবেচনায় রোগী দেখানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
একই ধরনের ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে পাশের চেম্বারে চিকিৎসক ডা. জেবুন্নাহারের কাছেও। সেখানে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এক সপ্তাহ আগে সিরিয়াল নিয়েও নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন রোগীরা।
জাহানারা বেগম নামের এক রোগী বলেন, ‘ডা. জেবুন্নাহারকে দেখানোর জন্য এক সপ্তাহ আগে সিরিয়াল নিয়েছিলাম। আমাকে বিকেল সাড়ে ৫টায় আসতে বলা হয়েছিল। অথচ রাত ১০টা বাজলেও সিরিয়াল পাইনি। রোগীদের সঙ্গে তাঁদের আচরণ অত্যন্ত অমানবিক।’
আরেক রোগী ইয়াসমিন আক্তার জানান, তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর চিকিৎসকের দেখা পেলেও তাঁকে মাত্র দুই মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসক তাঁকে ছয় থেকে সাতটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালটির অধিকাংশ চিকিৎসকের চেম্বারেই দীর্ঘ অপেক্ষা ও অব্যবস্থাপনার এমন চিত্র প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রোগীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা এবং চিকিৎসকদের সহকারীদের আচরণ পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দেওয়ার পর চিকিৎসকদের চেম্বারে প্রবেশের অনুমতিও মেলেনি।
রোগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে কুমিল্লা ইবনে সিনা হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন অপু বলেন, ‘চিকিৎসকদের কিছুটা গাফিলতির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। কোনো চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোগীদের বসিয়ে রেখে দুর্ভোগ সৃষ্টি করলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, কিছু চিকিৎসক ঢাকা থেকে যাতায়াত করেন। ফলে মহাসড়কে যানজটের কারণে অনেক সময় তাঁদের হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। তবে যেসব চিকিৎসক স্থানীয়ভাবে কুমিল্লায় অবস্থান করেন, তাঁদের যথাসময়ে হাসপাতালে উপস্থিত হওয়া উচিত।



