ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপুল মুনাফার মুখ দেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর—এই ছয় মাসে দেশটির ৫০টিরও বেশি বড় জ্বালানি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। বিপরীতে, জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগের বছরের একই সময়ে এসব কোম্পানির সম্মিলিত মুনাফা ছিল ৪৭০ কোটি ডলারেরও কম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তাদের ছয় মাসের মুনাফা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ জ্বালানি আগে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সম্প্রতি পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এলেও খুচরা বাজারে জ্বালানির দাম এখনো কমেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান শেভরন পরিশোধন, জ্বালানি বিপণন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে ৪৯৩ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় প্রায় চার গুণ। কোম্পানিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগে এটিই এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফা।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সচল শোধনাগারগুলো বাড়তি মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে সম্প্রতি রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে ইউক্রেন। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য এসব হামলাকে দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন সাধারণ পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলার ২০ সেন্ট। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই দাম ছিল ২ ডলার ৯৮ সেন্ট। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) এ তথ্য জানিয়েছে।
ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৩ ডলার ৬৮ সেন্ট। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ ডলার ৩২ সেন্টে। অর্থাৎ প্রতি গ্যালনে দাম বেড়েছে ২ ডলার ৬৪ সেন্ট বা প্রায় ৭২ শতাংশ।
মার্কেটওয়াচের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেরেক রেইসফিল্ড সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধন সক্ষমতার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন বাড়ানোর জটিলতার কারণে ডিজেলের দাম উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে এ সমস্যার সমাধানের কোনো সহজ পথ নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরেই এ সংকট তৈরি হচ্ছিল।
নিজেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির সমর্থক হিসেবে তুলে ধরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফা এবং এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের বাড়তি ব্যয় নিয়ে আগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি তাকে সন্তুষ্ট করছে না।
তবে গত সপ্তাহান্তে জর্জিয়ায় এক সমাবেশে তার বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যায়। সেখানে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস খাত শত শত কোটি ডলার আয় করছে। যুদ্ধের কারণে দেশ বিপুল অর্থ পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি জ্বালানি খাতের এই আর্থিক সাফল্য নিয়ে প্রকাশ্যে বেশি কথা না বলতে তার উপদেষ্টারা তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য পেট্রলের দাম কমানোই প্রেসিডেন্টের প্রধান অগ্রাধিকার। তার দাবি, ট্রাম্পের নেতৃত্বে জ্বালানির দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল।
শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে রজার্স আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ হলে পেট্রলের দাম দ্রুত কমে আসবে। একই সঙ্গে ইরানের শাসকগোষ্ঠী যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস



