ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ৩৫ জন আহত হয়েছেন। সোমবার (২৯ জুন) সংঘটিত এ হামলাকে ‘ভয়াবহ আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মস্কো। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৬ হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কি জানান, মধ্যাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে পাঁচজন নিহত এবং ২৯ জন আহত হন। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জাপোরিঝঝিয়ায় একটি যাত্রীবাহী মিনিবাসে রুশ ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুমি অঞ্চলে পৃথক ড্রোন হামলায় ৬৯ বছর বয়সী এক নারী ও ৭৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ। দেশটির আরও অন্তত ছয়টি অঞ্চলে প্রাণঘাতী হামলার খবর দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউক্রেনের জাতীয় গ্রিড অপারেটর উক্রেনেরগো জানিয়েছে, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে রুশ হামলায় আটটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এ ঘটনার পর ইউরোপের প্রতি আবারও শক্তিশালী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনের সক্ষমতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে ইউরোপের নিজস্ব আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে আরও সক্রিয় হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়া ও রুশ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা রুশ বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং তাদের অগ্রযাত্রার গতি কমিয়ে দিয়েছে।
ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের অগ্রগতিও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় বিদেশি সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দেশটি এখন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোকেও ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রোববার (২৮ জুন) স্বীকার করেন, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এই সংকট সত্ত্বেও ইউক্রেনে সামরিক অভিযান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি পুতিন। তিনি দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে রাশিয়ারই জয় হবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও জানিয়েছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং রুশ বাহিনী তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) বলেছে, ক্রেমলিনের কঠোর অবস্থান মূলত পশ্চিমা দেশ ও ইউক্রেনকে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সামরিক কার্যকারিতা আগের তুলনায় কমেছে এবং তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত তারা ২০৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, একই সময়ে রাশিয়ার ছোড়া ১০৮টি ড্রোনের মধ্যে ৮২টি তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র: এবিসি নিউজ।



