অজানা রোগের জীবাণু শনাক্ত করা থেকে শুরু করে গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা নির্ধারণ—চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে মেটাজিনোমিক পরীক্ষা। জিনগত উপাদান বিশ্লেষণের এই পদ্ধতিতে একই সঙ্গে নমুনায় থাকা বিভিন্ন অণুজীবের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসসহ নানা ধরনের জীবাণু শনাক্ত করার পাশাপাশি আগে কখনো শনাক্ত হয়নি, এমন জীবাণুর অস্তিত্বও খুঁজে বের করতে পারে এই প্রযুক্তি।
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির জন্য দায়ী নতুন করোনাভাইরাস শনাক্তের ক্ষেত্রেও মেটাজিনোমিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমানে সংক্রমণ নির্ণয়, জটিল রোগের কারণ অনুসন্ধান এবং দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণে হাসপাতালগুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উন্নত জিনগত বিশ্লেষণ প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মেটাজিনোমিক পরীক্ষা আগের তুলনায় দ্রুত ও সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এতে বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন করোনাভাইরাস শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের তিনটি বড় শহরের ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের একটি দল রহস্যজনক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা বিশ্লেষণ শুরু করেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবাই চীনের উহানের হুয়ানান সামুদ্রিক খাবারের বাজারে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর তাঁরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।
প্রাথমিক পরীক্ষায় নমুনাগুলোর জিনগত উপাদানের সঙ্গে পরিচিত কোনো রোগজীবাণুর মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে গবেষকেরা মেটাজিনোমিক পরীক্ষার সাহায্য নেন। প্রচলিত পরীক্ষায় সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু জীবাণুর উপস্থিতি খোঁজা হয়। কিন্তু মেটাজিনোমিক পদ্ধতিতে নমুনায় থাকা বিভিন্ন অণুজীবের জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে আগে অজানা জীবাণুও শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, রোগীদের নমুনায় পাওয়া জীবাণুটির সঙ্গে করোনাভাইরাস পরিবারের ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। এই পরিবারের কিছু ভাইরাস এর আগেও মানুষের মধ্যে গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ঘটিয়েছে। এর মধ্যে মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্সের ভাইরাসও রয়েছে।
এভাবে নতুন করোনাভাইরাসের জিনগত পরিচয় শনাক্ত করার পর দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা তৈরি, চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা এবং টিকা উদ্ভাবনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হয়।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক নিরঞ্জন নাগারাজান বলেন, আগের মহামারিগুলোর তুলনায় এটি ছিল একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। রোগের জন্য দায়ী জীবাণু দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা তৈরি করাও সহজ হয়েছিল।
জটিল রোগ নির্ণয়েও বাড়ছে ব্যবহার
মেটাজিনোমিক পরীক্ষার প্রয়োগ এখন আর শুধু মহামারি বা অজানা সংক্রমণ শনাক্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগ নির্ণয়েও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক চার্লস চিউ এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো রোগীর উপসর্গ সংক্রমণ কিংবা অটোইমিউন রোগ—দুই ধরনের সমস্যারই ইঙ্গিত দিতে পারে। ফলে রোগের প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেওয়া জটিল হয়ে ওঠে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মেটাজিনোমিক পরীক্ষা রোগের সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে প্রচলিত পরীক্ষায় জীবাণু শনাক্ত না হলে এটি অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে, যা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে আসে।
প্রচলিত পরীক্ষায় বাদ পড়া জীবাণুও শনাক্ত হচ্ছে
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর লন্ডনের দুটি হাসপাতালে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, প্রচলিত পরীক্ষায় নিয়মিত শনাক্ত করা যায় না—এমন রোগজীবাণুর উপস্থিতি প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে মেটাজিনোমিক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এই ফলাফল সংক্রমণ নির্ণয়ে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য কার্যকারিতা তুলে ধরে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের কারণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেওয়া সহজ হতে পারে।
তবে মেটাজিনোমিক পরীক্ষা সব রোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত পরীক্ষার বিকল্প নয়। নমুনার ধরন, পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ, খরচ এবং ফলাফলের ক্লিনিক্যাল তাৎপর্য বিবেচনা করা জরুরি। কোনো জীবাণুর জিনগত উপাদান পাওয়া গেলেই সেটি যে রোগীর অসুস্থতার মূল কারণ, তা সব সময় নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সব মিলিয়ে, মেটাজিনোমিক পরীক্ষা সংক্রমণ শনাক্তকরণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জিনগত বিশ্লেষণ প্রযুক্তির আরও উন্নতি হলে অজানা জীবাণু শনাক্ত, জটিল রোগের কারণ অনুসন্ধান এবং গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা নির্ধারণে এর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: বিবিসি



