tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকনির্বাচনের আগে চাপে ফ্রান্সের মধ্যপন্থিরা, বাড়ছে বাম ও ডানপন্থিদের প্রভাব

নির্বাচনের আগে চাপে ফ্রান্সের মধ্যপন্থিরা, বাড়ছে বাম ও ডানপন্থিদের প্রভাব

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্য দূর করা এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি রাজনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলেনশঁ ও কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরিন লো পেন পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন।

রোববার রাতে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভের সময় ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, যারা সম্পদ নষ্ট করেছে, তাদের এর মূল্য দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে প্রেসিডেন্ট কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করেননি।

প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইভরি-সুর-সেন এলাকার ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ানিস বলেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত তারা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আরও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। পরে আন্দোলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ।

তরুণদের সমর্থন পেতে সক্রিয় বামপন্থিরা

মেলেনশঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবো (এলএফআই) শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দলটির কর্মসূচিতে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পারকুরসুপ প্ল্যাটফর্ম বাতিলের মতো দাবি রয়েছে।

তবে দলটির সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, তারা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য কাজে লাগাচ্ছে। বিপরীতে দলটির সমর্থকদের মতে, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ওপিনিয়নওয়ের একটি জনমত জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে মেলেনশঁর প্রতি সমর্থন ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।

তরুণদের একাংশের কাছে মেলেনশঁকে সমর্থন করার অর্থ শুধু কট্টর ডানপন্থার বিরোধিতা নয়; বরং ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতিও অসন্তোষ প্রকাশ করা।

লুভর জাদুঘরে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিডিয়া বলেন, মধ্যপন্থিরা ক্ষমতায় থাকলে ম্যাক্রোঁর নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে ফ্রান্স আনবো ক্ষমতায় এলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা তিনিও দেখছেন না।

আইনশৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন লো পেন

অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরিন লো পেন বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনাগুলোকে সামনে এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার দল ন্যাশনাল র্যালির অভিযোগ, সরকার দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। দলটি মেলেনশঁর বিরুদ্ধেও সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

রোববার রাতে এক ভিডিওবার্তায় লো পেন ফ্রান্সের শহর ও রাস্তাঘাটে সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, দেশটি আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জনমত জরিপে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লো পেনের প্রতি ৩২ শতাংশ সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যেও তার দল উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে, মধ্যপন্থি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে উগ্র বামপন্থিরা সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে বামপন্থিদের বক্তব্য ও সরকারের দাবির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।

সংকুচিত হচ্ছে ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক পরিসর

ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক অবস্থান এর আগেও বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলনের মুখে পড়েছিল। তার শাসনামলের শুরুতে জ্বালানি কর বাড়ানোর প্রতিবাদে শুরু হওয়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নেয়।

বর্তমান অস্থিরতার সঙ্গে আগের আন্দোলনের মিল থাকলেও এবার সরকারের আর্থিক সক্ষমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রান্সের সরকারি বাজেট ঘাটতি গত বছর মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে জনঅসন্তোষ আরও না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা কমে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার রাজনৈতিক বিরোধীরা এই পরিস্থিতিকে সরকারের নীতির ব্যর্থতা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

রোববারের ভাষণে ম্যাক্রোঁ সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুকে দেন। তবে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট নীতির ঘোষণা দেননি তিনি।

২০২৭ সালের নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করায় ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে চলমান অস্থিরতা দেশটির পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের দাবিকে উপেক্ষা করার সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে ক্রমেই কমে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের তুলনামূলক কম ভোট দেওয়া এবং পেনশনের মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তাদের সমস্যাগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পেত না। বর্তমান আন্দোলন সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে।

তবে ফ্রান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বামপন্থিরা সামাজিক বৈষম্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রশ্ন সামনে আনছে, আর ডানপন্থিরা আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর জোর দিচ্ছে। মধ্যপন্থিরা এই দুই ধারার মধ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবং বর্তমান আন্দোলনের দাবির প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া তত বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে মধ্যপন্থিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু এই বিক্ষোভের মাধ্যমে নয়; অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাদের নীতিগত অবস্থানের ওপরও।