রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সবার। তাই ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার ভেদাভেদ ভুলে দেশের উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রংপুরের ধর্মসভা (রাধাগোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্দিরে পৌঁছে তিনি পূজারি ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে একটি ক্রেস্ট উপহার দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের হাতে ১০ লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানে সব ধর্মের মানুষের অবদান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করার সময় কোনো ধর্মের মানুষকে আলাদা করে দেখা হয়নি। বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব ধর্মের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই আন্দোলনেও সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। হাজার বছর ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবাইকে বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সরকার সবার জন্য কাজ করতে চায়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বর্তমান সরকার নির্বাচিত হয়েছে। কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, আবার কোনো এলাকায় হননি। কিন্তু সরকার এমনভাবে কাজ করতে চায়, যাতে যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—উভয় পক্ষই সমানভাবে সরকারি সেবা ও উন্নয়নের সুযোগ পান।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সব এলাকায় সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নে সম্প্রতি ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, স্কুল-কলেজের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
রাজনৈতিক বিভেদ নয়, স্থিতিশীলতা চান প্রধানমন্ত্রী
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে একটি মহল এ উদ্যোগ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত না করার আহ্বানও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদে তা তুলে ধরা উচিত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। সরকারও সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
‘এই বাংলাদেশ আমাদের সবার’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবাই মিলে এই বাংলাদেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। এ সময় মন্দিরের পেছনে থাকা হোস্টেলের মতো একটি অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু এবং সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীসহ দলীয় নেতা ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম রংপুর সফর
এর আগে বেলা ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রাধাগোবিন্দ মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম রংপুর সফর। রংপুরে যাওয়ার পথে তিনি তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় দুটি পথসভায় বক্তব্য দেন। সেখানেও সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তুলে ধরেন।



