জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তরুণদের নেতৃত্বে বিভাজনমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগ্রহীদের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে সামান্তা শারমিন এসব কথা বলেন। পোস্টে তিনি জানান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে বিভক্ত না করে ভিন্নমত ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করবে।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। তবে সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দল কিংবা কয়েকজন নেতার সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া মানেই মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে এখনো এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হবে মানুষকে বিভক্ত করা নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ করা।
এ ধরনের রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি কী হওয়া উচিত, তা-ও তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অভিন্ন অঙ্গীকারই হতে হবে এই ঐক্যের ভিত্তি। কোনো বিশেষ মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একক রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে ভিন্নমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে নিয়েই নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সামান্তা শারমিনের বক্তব্য, ভারতবিরোধিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতার কারণে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে নেওয়া স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।
তাঁর মতে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে যেমন তার বিরোধিতা করা প্রয়োজন, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সামান্তা শারমিন। একই সঙ্গে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ও সুরক্ষা, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সামান্তা শারমিনের দাবি, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ শুধু বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা করা নয়। দেশের অভ্যন্তরে জনগণের অধিকার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে এমন ক্ষমতাকাঠামো এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।
নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে পোস্টে তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না। মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে সামান্তা শারমিন জানান, এ ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ করতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময়ের জন্য আগ্রহীদের তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নিতে চান।
উল্লেখ্য, এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট রাজনীতি, নির্বাচনী কৌশল, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং নারী নেতৃত্বের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তুলে এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সামান্তা শারমিন। পদত্যাগের ব্যাখ্যায় দেওয়া তাঁর বক্তব্যে দলের রাজনৈতিক আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক আপত্তি তুলে ধরেন তিনি।



