tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশআমি সেই মধ্যবিত্ত, যে প্রতিদিন বাঁচে একটু একটু করে আত্মসমর্পণ করে

আমি সেই মধ্যবিত্ত, যে প্রতিদিন বাঁচে একটু একটু করে আত্মসমর্পণ করে

আমি সেই মধ্যবিত্ত, যার জীবনে না আছে মুক্তির স্বাদ, না আছে মৃত্যুর সাহস। প্রতিটি সকাল শুরু হয় একটি চাকরির আশায়, মাসের শেষে বেতনের অপেক্ষায় আর সমাজের কাছে মাথা নত করার অভ্যাসে। আমি সেই মানুষ, যে চোখের পানি লুকিয়ে রাখে, অনুভূতির চেয়ে হিসাবকে বড় করে দেখে। কতটা অন্যায় সহ্য করলে সংসার টিকবে, কতটা নীরব থাকলে পেটের ভাত জুটবে—সারাক্ষণ সেই হিসাবেই ডুবে থাকি।

আমি প্রতিবাদ করতে ভয় পাই, কারণ বিদ্রোহের মূল্য দিতে হতে পারে সন্তানের স্কুলের বেতন দিয়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারি না, পাছে পরিবারের কারও রুজি-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। আমি এমন এক বন্দি, যার কাছে শৃঙ্খলও এখন জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। চোখের সামনে রক্তপাত দেখেও আমার ভাবনায় আসে বাজারের ছাড়, সন্তানের কোচিংয়ের খরচ কিংবা দুই বিঘা জমিতে একদিন নিজের ফ্ল্যাট হওয়ার স্বপ্ন।

হে স্বাধীনতা! ইতিহাসের পাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে আর বক্তৃতার মঞ্চে তোমার কত মহিমা! অথচ আমার সংসারের বাস্তবতায় তোমার কোনো জায়গা নেই। তোমার সঙ্গে আমার গ্যাসের বিলের হিসাব মেলে না, তোমার আদর্শ দিয়ে ঘুষের বাজার চলে না। প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তুমি যেন এক বিলাসী ধারণা, যার প্রয়োজন অনুভব করারও অবকাশ আমার নেই।

আমি সেই সমাজের প্রতিনিধি, যে প্রতিনিয়ত নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হয়। শিক্ষা, ধর্ম, সংবাদমাধ্যম কিংবা রাজনীতি—কোনো ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলার সাহস যেন আর অবশিষ্ট নেই। আত্মসমর্পণ করতে করতে একসময় আমরা নিজেদের পরিচয়ও ভুলে যাই। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ভয়ের সংস্কৃতি উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে দিই পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। নিজের সন্তানকেও শেষ পর্যন্ত এটাই শেখাই—এই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইলে নয়, বেঁচে থাকতে চাইলে অনেক সময় মুখ বন্ধ রাখতে হয়, বাবা!