ঢাকার তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট এলাকায় বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় হেফাজতে থাকা তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পিবিআই সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানান, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে রাজবাড়ী ঘাটসংলগ্ন টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা যানটি তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত হতে যাচাই-বাছাই চলছে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে মোটরসাইকেলটি উত্তরখান থানায় রাখা হয়েছে। তদন্তে পিবিআইকে সহযোগিতা করছে নৌ পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। এরপর সারা রাত তাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ পুলিশকে জানান, ঘটনার দিন রাতে তারা দুজন রাজবাড়ী ঘাট এলাকায় কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি দেখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি নিজে সেখান থেকে পালিয়ে যান।
দীপের দাবি, যারা তাদের ধাওয়া করেছিলেন, তারা পুলিশের লোক ছিলেন। তবে তার এ বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পিবিআই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, রাজবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদক কারবারিদের পরিচিত আস্তানা। মাদক কারবারি কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির ধাওয়ার মুখে আতঙ্কিত হয়ে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে যেতে পারেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে দীপের বক্তব্যসহ সব ধরনের তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ। ওই দিন রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইল ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তিনি বাসায় ফেরার কথা জানান। কিন্তু এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরখান থানার রাজবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তার বন্ধু দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মোটরসাইকেলটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে মরদেহ উদ্ধারের স্থানের কাছাকাছি মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হওয়ায় তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
তবে তাহসিফের মৃত্যুকে স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ তার পরিবার। তাদের দাবি, বিমানবাহিনী থেকে অবসর দেওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
তাহসিফকে ঘিরে আলোচনায় রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ভিডিও। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণের সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে আলোচনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি তিনিই ধারণ করেছিলেন বলে দাবি করা হয়।
গত জুলাইয়ে একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে তাহসিফকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ওই ভিডিও ধারণের কারণেই বিমানবাহিনী থেকে তার চাকরি চলে গিয়েছিল কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘হতে পারে।’
সব মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে দুর্ঘটনা, ধাওয়া কিংবা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—কোনটি জড়িত, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল, বন্ধু দীপের বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগ সামনে রেখে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পিবিআই ও নৌ পুলিশ।



