বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় ডিজিটাল চুরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক দ্রুত শনাক্ত করে ফ্রিজ বা অকার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। তবে বাকি অর্ধেক এখনো হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা হ্যাকার গোষ্ঠী এ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। তবে দুটি শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট একটি কুখ্যাত হ্যাকার দলের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা উঠে এসেছে।
ব্লকচেইনভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা টিআরএম ল্যাবসের (TRM Labs) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাইন্যান্সে হামলার কৌশলের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধীদের আগের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে। বিশেষ করে গত বছর ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম বাইবিট (Bybit) থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হামলার বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে।
তবে এ হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য দেয়নি বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সম্পদের সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ক্রিপ্টো ব্যবহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম
দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন মাধ্যমে এ ধরনের লেনদেন অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেনালাইসিসের (Chainalysis) প্রকাশিত ‘দ্য ২০২৬ জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো রিপোর্ট’ অনুযায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের দিক থেকে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে। পাকিস্তানের অবস্থান ২৫তম এবং শ্রীলঙ্কা রয়েছে ৮২তম স্থানে। এর আগে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ক্রিপ্টো ব্যবহার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের পর বিশ্ব ক্রিপ্টো অর্থনীতি ধীরে ধীরে মন্দা কাটিয়ে উঠেছে। এ সময়ে বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বা ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমেছে। তবে ব্লকচেইনভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিমাণে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের সময়ের ৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কার্যক্রম কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
চলতি বছরের সূচক নির্ধারণে চারটি প্রধান বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে চেনালাইসিস। এগুলো হলো সার্ভিস ফ্লো, দেশের অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার (পি২পি) লেনদেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তর এবং অন-চেইন ব্যালেন্স।
এ সূচকে শীর্ষস্থান দখল করেছে ব্রাজিল। দেশটির ক্রিপ্টো অর্থনীতির পরিমাণ ২৫২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। সূচকের চারটি ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশটি।
২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ সময় বিটকয়েনের বাজারদর একপর্যায়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের পতন ঘটে। সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ডলারের হিসাবে এর দাম ৬৭ হাজার ডলার পর্যন্ত কমে যায়।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারদরে বড় ওঠানামা থাকলেও বৈশ্বিক ক্রিপ্টো কার্যক্রম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। সার্ভিস ইনফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর মিলিয়ে সামগ্রিক কার্যক্রম আগের সময়ের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশেও বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপল ও লাইটকয়েনের মতো বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রার অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৩ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এসব ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা কোনো দেশের স্বীকৃত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ইস্যু করা হয় না। ফলে এগুলোর বিপরীতে কোনো স্বীকৃত আর্থিক দাবি প্রতিষ্ঠিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনুমোদন করেনি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেন আইনগতভাবে বৈধ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে চেনালাইসিসের সূচক কোনো দেশের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের আইনি বৈধতা বা সরকারি স্বীকৃতি যাচাই করে না। বরং সাধারণ মানুষ বা তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবে কতটা লেনদেন হচ্ছে, সেটিই বিশ্লেষণ করে।
তার ভাষ্য, সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশের কিছু মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছেন। আন্তর্জাতিক এ প্রতিবেদনে মূলত সেই বাস্তব চিত্রই উঠে এসেছে।
অধ্যাপক মহিউদ্দিন আরও ব্যাখ্যা করেন, এ সূচক তৈরির ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের মোট ক্রিপ্টো লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা করা হয় না। বরং দেশটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কার্যক্রমের পরিমাণও হিসাব করা হয়। এ কারণে উন্নত দেশের তুলনায় কোনো উন্নয়নশীল বা নিম্ন আয়ের দেশে মোট লেনদেনের পরিমাণ কম হলেও মাথাপিছু হিসাবের ভিত্তিতে দেশটি সূচকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।
তার মতে, উন্নত দেশগুলোতে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রধানত বিকল্প বিনিয়োগ কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় এটি অনেকের কাছে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিভিন্ন জটিলতা এড়ানো এবং দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও স্টেবলকয়েনের ব্যবহার বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, প্রচলিত ব্যাংকিং বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকেও পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক, বিকেন্দ্রীকৃত এক্সচেঞ্জ এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করে ক্রিপ্টো লেনদেন চলছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপে থাকা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের লেনদেনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।



