চোখ লাল হওয়া, জ্বালাপোড়া কিংবা শুষ্কতার সমস্যা দেখা দিলেই অনেকেই চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিজে থেকেই আই ড্রপ ব্যবহার করেন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় মোবাইল ও কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে থাকা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করা কিংবা চোখের অ্যালার্জির কারণে এমন সমস্যা হলে ওষুধের দোকান থেকে ড্রপ কিনে সাময়িক স্বস্তি খোঁজেন অনেকে। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিশেষ ধরনের আই ড্রপ ব্যবহার করলে অজান্তেই চোখের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এমনকি অল্প বয়সেও দেখা দিতে পারে গ্লকোমার মতো জটিল রোগ।
চক্ষু চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেরয়েডযুক্ত আই ড্রপ এ ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের কারণ। এসব ড্রপ চোখের লালচে ভাব ও প্রদাহ দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে রোগী মনে করেন, চোখের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন কিংবা অনিয়ন্ত্রিতভাবে এগুলো ব্যবহার করলে চোখের ভেতরের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর পরিণতিতে তৈরি হতে পারে গ্লকোমার ঝুঁকি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় ‘স্টেরয়েড ইনডিউসড গ্লকোমা’। এতে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে অপটিক নার্ভ বা দৃষ্টিস্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিপজ্জনক বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে চোখের চাপ বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে রোগী তা বুঝতে পারেন না। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই দৃষ্টিস্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্টেরয়েডযুক্ত ড্রপ ব্যবহারের পরও চোখের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।
ছানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না
স্টেরয়েড আই ড্রপের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শুধু গ্লকোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন বা বারবার এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করলে চোখে ছানি পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এমনকি কম বয়সেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই চোখের লাল ভাব, চুলকানি কিংবা জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য নিজের সিদ্ধান্তে স্টেরয়েডযুক্ত ড্রপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, চোখে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ থাকলেও স্টেরয়েড ড্রপ বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এটি সাময়িকভাবে প্রদাহ ও লালচে ভাব কমিয়ে উপসর্গ আড়াল করতে পারে। এতে রোগী সংক্রমণ সেরে গেছে বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে জীবাণুর বিস্তার চলতে পারে। ফলে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয় এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
আই ড্রপ ব্যবহারে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
চোখের সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই নিজের মতো করে ড্রপ ব্যবহার করার প্রবণতা অনেকের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি অভ্যাস চোখের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
১. পুরনো প্রেসক্রিপশন অনুসরণ: ছয় মাস কিংবা এক বছর আগে চিকিৎসকের দেওয়া ড্রপ নতুন করে চোখের সমস্যা দেখা দিলে আবার ব্যবহার করা ঠিক নয়। আগের সমস্যার সঙ্গে বর্তমান সমস্যার কারণ নাও মিলতে পারে।
২. অন্যের ওষুধ ব্যবহার: পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কারও চোখের সমস্যায় কোনো ড্রপ কার্যকর হয়েছে বলে নিজের চোখেও সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রত্যেকের চোখের সমস্যা ও চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।
৩. সমস্যার কারণ না জেনে ড্রপ প্রয়োগ: চোখ লাল হওয়ার পেছনে অ্যালার্জি, শুষ্কতা কিংবা সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই রোগের কারণ না জেনে যেকোনো ড্রপ ব্যবহার করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চোখ সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন যত্ন
চোখে সামান্য শুষ্কতা বা অস্বস্তি হলেই ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। কিছু নিয়ম মেনে চললে এসব সমস্যা কমাতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
- ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করুন: প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে থাকা কোনো বস্তুর দিকে তাকান। এতে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে সাহায্য করে।
- নিয়মিত চোখের পলক ফেলুন: মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় পলক ফেলার হার কমে যেতে পারে। সচেতনভাবে ঘন ঘন পলক ফেললে চোখ আর্দ্র রাখতে সুবিধা হয়।
- চোখ কচলানো থেকে বিরত থাকুন: চোখে হাত দেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করুন। অপ্রয়োজনে চোখ ঘষবেন না।
- শুষ্কতা হলে পরামর্শ নিন: চোখের শুষ্কতা দূর করতে প্রয়োজনে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী কৃত্রিম অশ্রু বা লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে গ্লকোমা কিংবা অন্য কোনো রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকের দেওয়া নিয়মিত আই ড্রপ নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ করা যাবে না। চোখে বারবার লাল ভাব, ব্যথা, ঝাপসা দেখা কিংবা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ চোখের কিছু রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করাই দৃষ্টিশক্তি রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আনন্দবাজার



