tanaka

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, ফের আশাবাদী ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শিগগিরই শেষ হতে পারে বলে আবারও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুদ্ধের অবসান কীভাবে কিংবা ঠিক কত...
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনযৌথ পরিবারে অশান্তি, আলাদা সংসার করলে কি গুনাহ হবে? ইসলামের নির্দেশনা

যৌথ পরিবারে অশান্তি, আলাদা সংসার করলে কি গুনাহ হবে? ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামে পরিবারকে সমাজ ও সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সম্মান ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। একই সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এ প্রসঙ্গে যুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন—

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ

‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৭৩২)

তবে যৌথ পরিবারে বসবাস করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি তৈরি হলে কিংবা শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা না হলে আলাদা সংসার করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এমনই এক প্রশ্নে এক নারী জানিয়েছেন, তিনি ১৩ বছর ধরে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে বসবাস করেছেন। কিন্তু পারিবারিক কলহের কারণে বর্তমানে স্বামীকে নিয়ে আলাদা সংসার করছেন। এতে তার শাশুড়ি ছেলে ও পুত্রবধূকে বদদোয়া দিচ্ছেন। টাকা দিলে তা ফেরত দিচ্ছেন। এমনকি কাপড় বা খাবারের মতো উপহার দিলেও গ্রহণ করছেন না। আবার কিছু না দিলেও ঝগড়া করছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের কী করণীয়?

প্রশ্নটির শরিয়তসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিমানবন্দর এলাকার জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস মুফতি জাওয়াদ তাহের।

তিনি বলেন, স্ত্রীর জন্য পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। একটির কারণে অন্যটির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। স্ত্রীকে আলাদা বাসায় রাখা মানেই মা-বাবাকে ছেড়ে দেওয়া বা তাদের প্রতি দায়িত্বহীন হয়ে পড়া নয়।

একজন ব্যক্তি জীবিকা, চাকরি কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে দিনের বড় একটি অংশ বাড়ির বাইরে কাটান। একইভাবে চাইলে প্রতিদিন অথবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করা, তার খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সেবা-যত্নের ব্যবস্থা করতে পারেন। মা কোনো কারণে অসন্তুষ্ট থাকলেও ছেলে যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেন, আর্থিক সহায়তা দেন এবং সেবাযত্ন অব্যাহত রাখেন, তাহলে দায়িত্ব পালনে তার পক্ষ থেকে অবহেলা থাকবে না।

মা-বাবা ও স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে রক্ষা করতে ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উভয়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

শাশুড়ির দেওয়া বদদোয়া নিয়েও অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইসলামে মা-বাবার দোয়া ও বদদোয়ার গুরুত্ব থাকলেও অন্যায় বা পাপের উদ্দেশ্যে করা দোয়া কবুল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ

‘বান্দার দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো পাপের কাজের জন্য অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)

মুফতি জাওয়াদ তাহেরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্ত্রীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর শরিয়তসম্মত দায়িত্ব। স্ত্রীর অধিকার রক্ষা এবং পারিবারিক অশান্তি থেকে দূরে থাকার জন্য স্বামী আলাদা বাসার ব্যবস্থা করলে তা অন্যায় হবে না। তাই এ কারণে মায়ের অসন্তুষ্টি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে দেওয়া বদদোয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর অযথা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

শাশুড়ির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে উপহার বা অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেও যদি বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়, তাহলে জোর করে সেগুলো দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা উচিত নয়। নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, সালাম দেওয়া এবং যথাযথ সম্মান বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।

পারিবারিক বিরোধ নিরসনে প্রয়োজনে পরিবারের কোনো অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এমন কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা বিদ্যমান বিরোধকে আরও জটিল করে তোলে। একই সঙ্গে নিয়মিত ঝগড়া ও অপমানের পরিস্থিতি তৈরি হলে নিজের সংসারের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সীমারেখা নির্ধারণ করাও জরুরি।

শাশুড়ি রাগ করে কটু কথা বললে কিংবা ঝগড়া শুরু করলে উত্তেজিত হয়ে পালটা জবাব না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মুফতি। তার মতে, ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলানো উচিত। কারণ, ছোট একটি কথার জের ধরেও পারিবারিক বিরোধ বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সবার মানসিক শান্তি নষ্ট করে।

স্ত্রীর পৃথক বাসস্থানের অধিকার সম্পর্কে ইসলামের বিধান

স্ত্রীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। ইসলামী ফিকহের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে—

تجب السكنى لها عليه في بيت خال عن أهله وأهلها إلا أن تختار ذلك كذا في العيني شرح الكنز.

অর্থ: স্ত্রীর জন্য এমন একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব, যেখানে স্বামীর পরিবারের সদস্য কিংবা স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা থাকবেন না। তবে স্ত্রী নিজে যদি তাদের সঙ্গে বসবাস করতে সম্মত হন, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন।

(ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাক, বাবুস সাদাস আশার ফিন নাফাকাত, ফাসলুস সানি ফিস সুকনা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৫৬)

এ বিষয়ে আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ গ্রন্থেও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।

এর পক্ষে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতও উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ

‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বসবাস করো, তাদেরও সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৬)

আলোচ্য গ্রন্থে বলা হয়েছে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দতকালীন বাসস্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ যখন দেওয়া হয়েছে, তখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ স্ত্রীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা আরও বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য। স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা আল্লাহর নির্দেশ। তাকে নিরাপদ, সম্মানজনক ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার উপযোগী পরিবেশ দেওয়া সেই সদাচরণেরই অংশ।

এ ছাড়া স্বামী, স্ত্রী ও পিতা-মাতাকে একই বাড়িতে বসবাস করতে বাধ্য করা শরিয়তসম্মত নয়। একইভাবে স্বামীর অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে বসবাস করতেও স্ত্রীকে বাধ্য করা যাবে না। নিজের নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে পৃথক বাসস্থানের অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। এ অধিকার প্রয়োগে তাকে জোর করে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবসহ অধিকাংশ ফকিহের মতেও স্ত্রীর পৃথক বাসস্থানের অধিকার স্বীকৃত।

(আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ‘আস-সুকনা’, আল-আহকামুল মুতাআল্লিকাতু বিস-সুকনা, খণ্ড: ২৫, পৃষ্ঠা: ১০৮-১০৯)

সূত্র: মুসলিম বাংলা