আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের অপরিকল্পিত কুইক রেন্টাল নীতির কারণে বিএনপি সরকারের বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তাঁর মতে, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দেশকে আরও ৫০ থেকে ৬০ বছর ভুগতে হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত কারণ বুঝতে অতীতের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই বর্তমানে লোডশেডিং হচ্ছে। তিনি জানান, বিশেষ জ্বালানি আইন আগামী সংসদ অধিবেশনে চূড়ান্ত করা হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে উল্লেখ করে আগামী সোমবার থেকে সোলার এক্সিবিশন শুরু হওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জে হাত দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সরকারের নেই। এতে হস্তক্ষেপ করা হলে ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও সেগুলোর জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ কেনা এবং কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই সংকট রয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে কাতারের ওপর নির্ভরশীলতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বোমা হামলার কারণে কাতার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। একসময় ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা এলএনজি ৩০ ডলার দিয়ে কিনতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সব দিক সামলে সরকারের পক্ষে সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো—এমন দাবি তিনি করবেন না। খাতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে এবং আর্থিকভাবে ক্রমাগত ক্ষতি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে টুকু বলেন, অনেক এলাকায় যাতায়াতের উপযুক্ত রাস্তা নেই। ফলে বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করতেই দুই থেকে তিন দিন লেগে যায়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় লোডশেডিং হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক সময় এ বাস্তবতা বুঝতে চান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও আগের কোনো সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি একটি অধ্যাদেশও জারি করেছেন বলে জানান তিনি।
দেশের ভূগর্ভস্থ সম্পদ অনুসন্ধানে অতীত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও গত ১৭ বছরে একটি কূপও খনন করা হয়নি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের অনুপাতেও পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে বিদ্যুতের ৬৫ শতাংশ সরকারি খাতে উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গত ১৭ বছরে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সেই পরিকল্পনা বদলে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাতনির্ভর; সরকারি খাতে কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর কিছু যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে।
রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাঁর দল জোর করে ক্ষমতায় আসেনি এবং ১৭ বছর জোর করে ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যও তাদের ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রতিটি ছোট বিষয় সরাসরি নজরদারি করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন এমআইএস প্রতিবেদন পাঠানো হয়। একবার প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেদনে অসংগতি রয়েছে বলে জানানোর পর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) ডেকে বিষয়টি যাচাই করা হয়। পরে দেখা যায়, কারিগরি সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।



