বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরোয়ার ফরিদের আকস্মিক দিল্লি সফর ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লির নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন বাংলাদেশের এই শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তাঁর সফরের নির্দিষ্ট কর্মসূচি বা আলোচ্যসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
দিল্লির পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও আলোচনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এ সফরে হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হবে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে ব্যবধান
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। ঢাকা ইতোমধ্যে হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মেনে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও জানানো হয়নি।
হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোও প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে তাঁকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে ঢাকা ও নয়াদিল্লির অবস্থানের ব্যবধান দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতায় গুরুত্ব পেতে পারে সীমান্ত পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, সীমান্তপারের অপরাধ, জঙ্গি তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়েও নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দাপ্রধানের সফরে এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সম্ভাব্য বৈঠক বা আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ ছাড়া মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকটও দুই দেশের নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। মিয়ানমারের পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর পড়ে। সীমান্তপারের অনুপ্রবেশ, মানবপাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
অজিত দোভালের কথিত সফর নিয়েও আলোচনা
সরোয়ার ফরিদের দিল্লি সফরের আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের কথিত বাংলাদেশ সফর নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছিল। তবে ওই সফর সম্পর্কে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত বিবৃতি দেয়নি।
এ অবস্থায় দুই দেশের নিরাপত্তা পর্যায়ে সাম্প্রতিক যোগাযোগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে জল্পনা থাকলেও প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ কীভাবে মোকাবিলা করবে নয়াদিল্লি—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ।
দুই দেশের স্বার্থ ও অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সহজ নয়। এ কারণে সরোয়ার ফরিদের দিল্লি সফরকে শুধু একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিদেশ সফর হিসেবে না দেখে বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই সফরে হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কিংবা তাঁকে ফেরানোর সময়সূচি চূড়ান্ত হয়েছে—এমন দাবি সমর্থন করার মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।



