tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকরাস্তার শরবত বিক্রেতা থেকে তুরস্কের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতা এরদোগান

রাস্তার শরবত বিক্রেতা থেকে তুরস্কের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতা এরদোগান

রক্ষণশীল ও সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে বেড়ে ওঠা থেকে তুরস্কের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা—রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের রাজনৈতিক জীবন নানা বাঁক ও নাটকীয় ঘটনায় ভরা। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্ব, কারাবরণ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক পেরিয়েছেন তিনি।

কীভাবে ইস্তাম্বুলের কাসিমপাসার এক সাধারণ পরিবারের সন্তান তুরস্কের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হলেন, সেই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ফিরে দেখা যাক।

সংগ্রামী শৈশব থেকে রাজনীতিতে

ইস্তাম্বুলের কাসিমপাসা এলাকায় বেড়ে ওঠেন এরদোগান। শৈশব ও কৈশোরে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে রাস্তায় রুটি ও লেবুর শরবত বিক্রি করেছেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ফুটবলের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল।

পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাও গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭০-এর দশকে তরুণ বয়সেই তুরস্কের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়।

ইস্তাম্বুলের মেয়র হয়ে প্রথম বড় সাফল্য

১৯৯৪ সালে ওয়েলফেয়ার পার্টির প্রার্থী হিসেবে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন এরদোগান। সে সময় তুরস্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এই শহরের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন তার জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

মেয়র থাকাকালে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ নগরসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরবাসীর একটি অংশের মধ্যে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

কবিতা আবৃত্তি, মামলা ও কারাবরণ

এরদোগানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় মোড় আসে ১৯৯৭ সালে। একটি জনসভায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বক্তব্যসংবলিত কবিতা আবৃত্তিকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

১৯৯৮ সালে ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগে তাকে মেয়রের পদ ছাড়তে হয় এবং কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কয়েক মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান তিনি। এই ঘটনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হলেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করে।

একে পার্টি গঠন ও ২০০২ সালের নির্বাচন

কারামুক্তির পর তুরস্কের প্রচলিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ধারার বাইরে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেন এরদোগান। ২০০১ সালে তিনি সহকর্মীদের নিয়ে ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’—একে পার্টি (AK Party) প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০২ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটি বড় জয় পায় এবং সরকার গঠন করে। নির্বাচনের পর সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিবর্তন

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালে তুরস্কের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ নিয়ে তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাতেও বিভিন্ন সংস্কার নেওয়া হয়।

তবে তার দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধিতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে দেশটির ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সমালোচনাও রয়েছে। ফলে এরদোগানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়নে সাফল্য ও বিতর্ক—দুই দিকই আলোচনায় আসে।

প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট

২০১৪ সালে এরদোগান তুরস্কের প্রথম সরাসরি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে সংসদে নির্বাচিত হতেন।

পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটে এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

২০১৮ সালে নতুন ব্যবস্থার অধীনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এরদোগান রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা পান। এভাবেই ইস্তাম্বুলের স্থানীয় রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি তুরস্কের জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী নেতৃত্বগুলোর একটিতে পরিণত হন।

সূত্র: ব্রিটানিকা, বিবিসি।