দেশে ফের ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪ হাজার ৮৪৮ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৭১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন এবং আগস্টের প্রথম ১৭ দিনে ৯ হাজার ৫৩৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ শুধু জুলাই ও আগস্টের প্রথম ১৭ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৭৪৪ জন।
একসময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায়—১৮১ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ১৫৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৪৬, বরিশালে ১০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৭, রাজশাহীতে ৫৭, ময়মনসিংহে ৫১ এবং রংপুরে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের মোট ২৪ হাজার ৮৪৮ রোগীর মধ্যে সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার রোগী ১৭ হাজার ৯৬৭ জন। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৫১৫ জন। ফলে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন শুধু রাজধানী বা নগরকেন্দ্রিক নয়—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটছে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে চলতি বছরে ১ হাজার ১৯৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন তিনজন। শুধু আগস্টের প্রথম ১১ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে চট্টগ্রাম নগরের ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। পরীক্ষিত ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতেই লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্ষাকালে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকে। আগস্টে সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭১ জনের মধ্যে ২৮ জন পুরুষ ও ৪৩ জন নারী। সবচেয়ে বেশি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে। এ ছাড়া ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী আটজন এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সাতজন মারা গেছেন। ১৫ বছর বা তার কম বয়সী অন্তত নয়জনও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
শুধু জুলাই মাসেই ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। জুনে মারা গেছেন ১৩ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশই ঘটেছে গত দুই মাসে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটে ব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক কম। তবে জেলায় জেলায় চিকিৎসার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



