tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি, লিগ্যাল নোটিশ

সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি, লিগ্যাল নোটিশ

সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ এবং দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জনস্বার্থে সাধারণ নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার রেজিস্টার্ড ডাক ও ই-মেইলের মাধ্যমে এ নোটিশ পাঠান।

নোটিশে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৩১ হাজার ১২০টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল। বর্তমানে আপিল বিভাগে ছয়জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০৩ জন বিচারপতি কর্মরত। বিপুলসংখ্যক মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৬ হাজার এবং আপিল বিভাগে ন্যূনতম সাতজন বিচারপতি রাখার সুপারিশ করেছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৯৪ হাজার ৪৪৪ জন মানুষের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এ অনুপাতও কম বলে দাবি করা হয়েছে।

হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বেঞ্চ বাড়ানোর দাবি

হাইকোর্ট বিভাগে বাণিজ্যিক মামলা নিষ্পত্তির জন্য বর্তমানে মাত্র দুটি বেঞ্চ কার্যকর রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা।

নোটিশে বলা হয়, ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি থাকলেও বর্তমানে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে একাধিক বেঞ্চ পরিচালনা এবং বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের হওয়া মামলার মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং আপিল বিভাগে ১৮ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি

নোটিশে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার, বসার জায়গা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, লাইব্রেরি ও ডিজিটাল সুবিধার ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় আদালতের করিডোরে অপেক্ষা করতে হয়। এজলাস সংকট ও ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণেও বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

যেসব দাবি জানানো হয়েছে

নোটিশে আইনজীবীদের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচার বিভাগের জন্য যৌক্তিক বাজেট কাঠামো প্রণয়ন এবং হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক বিচারপতি নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া মামলার সংখ্যা, নিষ্পত্তির হার ও নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় বিচারক ও বেঞ্চের সংখ্যা নির্ধারণ, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্বের পৃথক ও স্বচ্ছ বার্ষিক হিসাব প্রকাশের দাবি করা হয়েছে।

নোটিশে সংবিধানের ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করতে পর্যাপ্ত অর্থ ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি থাকলে এ স্বাধীনতা কার্যকর করা কঠিন।

বাজেট বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন

নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ২৭০ কোটি টাকা। দেশের সামগ্রিক বাজেটের তুলনায় সুপ্রিম কোর্টের জন্য এ বরাদ্দ অত্যন্ত কম বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা।

বিচার বিভাগের সামগ্রিক বরাদ্দ নিয়েও নোটিশে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পুরো বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, বিপুলসংখ্যক নাগরিকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বিচার বিভাগের জন্য তুলনামূলক কম বরাদ্দ রাষ্ট্রের অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, গত দুই দশকে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। কোনো কোনো বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন খাতেও বরাদ্দ ছিল না।

আইনজীবীদের দাবি, উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ও অবকাঠামো বাড়ানো হয়নি। এতে বিচারক ও মামলার সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের জন্য শুধু ব্যয়ের খাত নয়; কোর্ট ফি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক, প্রসেস ফি ও জরিমানার মাধ্যমে এ বিভাগ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্বও যোগ করে। তবে বিচার বিভাগের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট রাজস্বের পৃথক ও স্বচ্ছ সরকারি হিসাব প্রকাশ করা হয় না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইনজীবীরা নোটিশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের নেওয়া পদক্ষেপ লিখিতভাবে জানাতে বলেছেন।

অন্যথায় সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগে জনস্বার্থে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে।