ফেসবুকে পরিচয়, ১৭ দিনের সম্পর্ক। রাজু চৌধুরী নামে এক যুবকের ডাকে সাড়া দিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। কক্সবাজার থেকে ফেরার পর বাড়িতে যাওয়ার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার (৩৫) হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে।
রাজু চৌধুরীর বয়স ২০ বছর। তিনি কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে জানা গেছে। তবে তাজমিন ঠিক কবে কক্সবাজার গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকার মধ্যে প্রথমে সে পাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে পরে কক্সবাজারে পাড়ি জমায়। যাওয়ার সময় মাকে জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে।
কক্সবাজারে বাসের টিকিট কাটতে গিয়েছিল দুজন
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ শনিবার রাতে জানান, ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত ৮টার পর তাজমিন তার বন্ধু রাজুকে সঙ্গে নিয়ে বাসের টিকিট কাটতে কাউন্টারে আসে। তখন তাঁদের একজন ছেলে ও একজন মেয়ে যাত্রী হিসেবেই মনে হয়েছিল। বিষয়টিকে স্বাভাবিক যাত্রীসেবা হিসেবেই দেখেছিলেন তাঁরা।
আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু পরদিন বুধবারের জন্য একটি বাসের টিকিট কাটেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রাতে বাসটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা প্রবেশমুখ পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানে পৌঁছায়।
সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজে বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাস থেকে নামতে দেখা গেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসার পর আবদুল্লাহ বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেন এবং ফুটেজে থাকা মেয়েটিকে তাজমিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশ প্রয়োজনে তথ্য চাইতে পারে—এমন ধারণা থেকেই তিনি বিষয়টি মনে রাখেন বলে জানান।
পরে তিনি জানতে পারেন, তাজমিনের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া রাজু হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি একজনই—সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। এরপর রাজুর বিষয়ে আর খোঁজ নেননি আবদুল্লাহ।
শেষ কথোপকথনেও মাকে জানায়নি বান্ধবীর পরিচয়
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে নিয়ে আসতে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন মা। কিন্তু বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।
মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন এবং তাকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীকে সন্দেহ করছেন, বয়সে তিনি তাজমিনের চেয়ে বড়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা তাঁর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিনের আচরণেও পরিবর্তন এসেছিল। সে মোবাইল গেমে, বিশেষ করে পাবজিতে, আসক্ত ছিল বলে জানা গেছে।
চঞ্চল তাজমিনের জীবনে ছিল পারিবারিক দায়িত্বও
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ থাকলে নিজের দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে।
শিক্ষক জানান, তাজমিনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে তাঁকে রাতে ফিরতে হতো। তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন তিনি। ঘরে রাগ বা অভিমান হলে তাজমিন হুটহাট করে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত বলেও জানান তার শিক্ষক।
বাড়ি ফেরার পথে অটোরিকশাচালকের হাতে হত্যা
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানে নেমে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। অটোরিকশাচালক সুমন তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সম্পর্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না থাকলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। সে ক্ষেত্রে এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না বলে তাঁর ধারণা।
তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যু কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন পরিচয়, সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে কোনো সম্পর্ক বা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য একজন কিশোরীকে দায়ী করা যায় না। বরং এমন ঘটনায় অপরাধীর দায় নির্ধারণ, শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে পরিবারের আস্থাপূর্ণ যোগাযোগ গড়ে তোলার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।



