মূত্রথলির ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া কিংবা প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তনের মতো উপসর্গকে অনেকে সাধারণ সংক্রমণ ভেবে অবহেলা করেন। অথচ এসব লক্ষণ মূত্রথলির ক্যানসারেরও ইঙ্গিত হতে পারে। পুরুষদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি হলেও নারীরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
মূত্রথলি কিডনি থেকে আসা প্রস্রাব জমা রাখে এবং পরে শরীর থেকে বের করে দেয়। মূত্রথলির কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে সেগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে ক্যানসার তৈরি হতে পারে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না করা হলে রোগটি আশপাশের টিস্যু এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মূত্রথলির ক্যানসারের ধরন
মূত্রথলির ভেতরের আবরণে থাকা কোষ থেকে সাধারণত এ ক্যানসারের উৎপত্তি হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ইউরোথেলিয়াল কারসিনোমা, যা ট্রানজিশনাল সেল কারসিনোমা নামেও পরিচিত। এ ধরনের ক্যানসার কিডনি ও মূত্রনালির আবরণেও হতে পারে।
এ ছাড়া মূত্রথলিতে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা, অ্যাডেনোকারসিনোমা, স্মল সেল কারসিনোমা ও সারকোমার মতো বিরল ধরনের ক্যানসার হতে পারে।
ক্যানসার মূত্রথলির ভেতরের স্তরে সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি পেশি ও আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছে—তার ওপর রোগের পর্যায়, জটিলতা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ভর করে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
১. প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া
মূত্রথলির ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া। কখনো প্রস্রাব গোলাপি, লালচে বা গাঢ় রঙের হতে পারে। আবার রক্তের উপস্থিতি শুধু পরীক্ষার মাধ্যমেও ধরা পড়তে পারে। একবার রক্ত দেখা দিয়ে পরে বন্ধ হয়ে গেলেও বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
২. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
স্বাভাবিকের তুলনায় বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া, বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া, সতর্কতার লক্ষণ হতে পারে।
৩. প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
প্রস্রাব করার সময় ব্যথা, অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। তবে এসব উপসর্গ মূত্রনালির সংক্রমণসহ অন্যান্য সমস্যার কারণেও দেখা যায়।
৪. প্রস্রাবের প্রবাহে পরিবর্তন
প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া, থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া কিংবা প্রস্রাব করতে অসুবিধা হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
রোগের অগ্রগতির সঙ্গে কোমর বা পিঠে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, হাড়ে ব্যথা কিংবা প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এসব উপসর্গ থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়; পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে?
মূত্রথলির ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। তবে কোষের জিনগত পরিবর্তন এ রোগের বিকাশে ভূমিকা রাখে। কয়েকটি বিষয় এ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
-
ধূমপান: মূত্রথলির ক্যানসারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তামাকের ক্ষতিকর রাসায়নিক রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে পৌঁছে প্রস্রাবের সঙ্গে মূত্রথলিতে জমা হতে পারে।
-
বয়স বৃদ্ধি: সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়।
-
লিঙ্গ: নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
-
রাসায়নিকের সংস্পর্শ: কিছু শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
-
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ: মূত্রথলির দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা নির্দিষ্ট ধরনের সংক্রমণের সঙ্গে কিছু ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে।
-
চিকিৎসার ইতিহাস: আগে নির্দিষ্ট কিছু কেমোথেরাপির ওষুধ বা রেডিওথেরাপি নেওয়ার সঙ্গে ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
-
পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারের সদস্যদের এ রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।
ধূমপান ত্যাগ করা এবং কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষা নেওয়া ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
যেভাবে শনাক্ত করা হয়
মূত্রথলির ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, বয়স, ধূমপানের ইতিহাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যতথ্য বিবেচনা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়।
-
প্রস্রাব পরীক্ষা: প্রস্রাবে রক্ত, সংক্রমণ বা অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি যাচাই করা হয়।
-
সিস্টোস্কোপি: ক্যামেরাযুক্ত সরু নল দিয়ে মূত্রথলির ভেতরের অংশ পরীক্ষা করা হয়।
-
বায়োপসি: সন্দেহজনক টিস্যুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষ আছে কি না নির্ণয় করা হয়।
-
আল্ট্রাসনোগ্রাম ও সিটি স্ক্যান: মূত্রথলির অস্বাভাবিকতা এবং প্রয়োজনে রোগের বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
মূত্রথলির ক্যানসারের চিকিৎসা
ক্যানসারের ধরন, পর্যায়, টিউমারের অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। চিকিৎসায় সাধারণত নিচের পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হতে পারে।
-
অস্ত্রোপচার: টিউমার অপসারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে মূত্রথলির অংশবিশেষ বা পুরো মূত্রথলি অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
-
কেমোথেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
-
বিসিজি থেরাপি: মূত্রথলির ভেতরে বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োগ করে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করা হয়। নির্দিষ্ট পর্যায়ের ক্যানসারে এটি ব্যবহার করা হয়।
-
ইমিউনোথেরাপি: শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করে।
-
রেডিওথেরাপি: উচ্চশক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়।
চিকিৎসার পরও মূত্রথলির ক্যানসার ফিরে আসতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
মূত্রথলির ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নেই। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
-
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার করুন।
-
কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করুন।
-
পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যদি চিকিৎসক তরল গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ না দিয়ে থাকেন।
-
প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে বা প্রস্রাবের অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
-
চিকিৎসা চললে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফলোআপ করুন।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা কেন জরুরি?
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মূত্রথলির ক্যানসার মূত্রথলির বাইরে ছড়ায়নি—এমন পর্যায়ে শনাক্ত হলে পাঁচ বছর আপেক্ষিক বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯৭ শতাংশ। দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে বেঁচে থাকার হার রোগের পর্যায়, রোগীর স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিষয় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া কিংবা প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ ও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে ও আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি। স্বাস্থ্যবিষয়ক এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।



