tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ৩৬ শতাংশই বেকার: আইএমএফ

দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ৩৬ শতাংশই বেকার: আইএমএফ

বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন উচ্চশিক্ষিত তরুণের মধ্যে প্রায় ৩৬ জনই বেকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় যুব বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণার ফল আইএমএফের সাময়িকী ‘ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি উচ্চমাধ্যমিক বা তার পরবর্তী স্তরের শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিক যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০ শতাংশ। এর বিপরীতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক যুব বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো এশিয়াজুড়েই যুব বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বমুখী। তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে তৈরি হওয়া একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার তথ্যভুক্ত তিনটি অর্থনীতির মধ্যে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হারে শীর্ষে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে এ হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে ভারত, যেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব প্রায় ৪২ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৩৬ শতাংশ।

তুলনামূলক আলোচনায় থাকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ অর্থনীতির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার অনেক বেশি। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় সামগ্রিক যুব বেকারত্বের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি—যথাক্রমে প্রায় ১৮ শতাংশ ও ২২ শতাংশ।

অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর চিত্র তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। ইন্দোনেশিয়ায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ১৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১৬ শতাংশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ১৩ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ১২ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে এ হার আরও কম—প্রায় ৮ শতাংশ।

তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার বেশি। উদাহরণ হিসেবে আইএমএফের প্রতিবেদনে থাইল্যান্ডের কথা তুলে ধরা হয়েছে। দেশটিতে গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ একই বয়সী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩ শতাংশ—যা সামগ্রিক হারের প্রায় তিনগুণ।

আইএমএফ এ পরিস্থিতিকে ‘গ্র্যাজুয়েট গ্ল্যাট’ বা উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটের আধিক্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর অর্থ হলো, শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও তাদের যোগ্যতা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ একই হারে তৈরি হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি খুঁজছেন কিংবা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতার কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত তরুণ কর্মীরা তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে।’

প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের দ্রুত ব্যবহার শ্রমবাজারে প্রবেশ পর্যায়ের বিভিন্ন চাকরিকে প্রভাবিত করছে।

আইএমএফের মতে, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, অ্যানিমেটর ও প্রশাসনিক কর্মীদের মতো প্রাথমিক স্তরের কারিগরি পদগুলোতে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু এআই মডেল ও অটোমেশনের দ্রুত বিস্তারের ফলে এসব পদের কিছু কাজ এখন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য প্রবেশ পর্যায়ের চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ফলে শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোই নয়, শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মক্ষেত্রের জন্য তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা এবং উচ্চশিক্ষিতদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্যটি সেই চ্যালেঞ্জেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে উঠে এসেছে।