tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতিতে জড়িতদের ছাড় নয়: সংসদীয় কমিটি

সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতিতে জড়িতদের ছাড় নয়: সংসদীয় কমিটি

সরকারি অর্থের অপচয়, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলেও দুর্নীতি ও অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করা হয়েছে।

রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির অষ্টম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ উঠে আসে। কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক এবং মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া।

বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাবসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট (রিপোর্ট নং-২৮/২০২৩) এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট (রিপোর্ট নং-২১/২০২২) নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।

এ ছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এসব আপত্তির মধ্যে অর্থ আদায়, সমন্বয়, অবলোপন, প্রমার্জন, নিয়মিতকরণ ও ভূতাপেক্ষ অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আপত্তি এবং কমিটির আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কমিটি স্পষ্ট করে জানায়, সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কেউই দায়মুক্তি পাবেন না। বর্তমান সরকারের সময়েও কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা সরকারি অর্থের অপব্যবহার সহ্য করা হবে না।

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি ই-বিলিং ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক পরিশোধ এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এতে বন্দরসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতা বাড়বে বলে মনে করছে কমিটি।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে, বিশেষ করে সমস্যাগ্রস্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে বন্দর কর্তৃপক্ষের এফডিআর বিনিয়োগ নিয়েও বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আমানতের অর্থ উত্তোলন না করা এবং নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে।

এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা, প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে কমিটিকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়। ভবিষ্যতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সব অর্থ সরকারি ব্যাংকে জমা রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনার ও যানবাহনসংক্রান্ত জটিলতা আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে খালি কনটেইনারের নামে বন্দর থেকে মালবাহী কনটেইনার বের করে নেওয়া এবং কনটেইনার চুরির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরবর্তী বৈঠকে কমিটিকে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।

মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম, নির্ধারিত ড্রাফট ও নাব্যতা অর্জন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এসব প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের তহবিল থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপিত হয়। অডিট আপত্তিতে উঠে আসা এ ধরনের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

বৈঠকে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিব, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।