যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দলটির হাতে। ফলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। খবর বিবিসির।
নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও উচ্চকক্ষ সিনেট—উভয়টির নিয়ন্ত্রণ ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। তবে এবারের নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। শুধু তাই নয়, কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও কানসাসের মতো রাজ্যেও আসন ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি। এই ফলাফল ট্রাম্প ও তাঁর দলের প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত।
নির্বাচনে ভরাডুবির পর পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একাধিক বিষয় সামনে এনেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্পের মতে, গ্যাসের অতিরিক্ত দাম এবং জ্বালানির পেছনে সাধারণ মানুষের বাড়তি ব্যয় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। নির্বাচনী জরিপেও উঠে এসেছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত। তবে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্তকে এখনো ‘খুবই বুদ্ধিদীপ্ত’ বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনে পরাজয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ব্যালটে তাঁর নিজের নাম থাকলে রিপাবলিকানদের এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলাম না। আর আমি প্রার্থী না থাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারিনি।’
এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের সমর্থন দেওয়া কয়েকজন পরাজিত রিপাবলিকান প্রার্থী নিয়েও কিছুটা অনুশোচনা প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, পরাজিত ওই প্রার্থীরা আরও ভালো প্রার্থী হতে পারতেন।
তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের প্রশংসাও করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে ভালো করেছে।’ রিপাবলিকানদের দেশজুড়ে বড় বড় জনসভা ও ব্যাপক প্রচার চালানোর পরও ডেমোক্র্যাটদের এমন সাফল্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে আগামী দিনগুলোতে নিজের রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। বিষয়টি উপলব্ধি করেই বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ও যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার মতো ‘অনেক অনেক বিষয়’ রয়েছে। তবে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নিজের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে অনড় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, প্রয়োজন হলে তিনি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতেও পিছপা হবেন না।
এদিকে, ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে হোয়াইট হাউস থেকেও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ওভাল অফিসের বিখ্যাত রেজলিউট ডেস্কের ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখা যায়।
ছবিটির সঙ্গে দেওয়া বার্তায় লেখা হয়, ‘জনস্বার্থে বার্তা: ট্রাম্প এখনো আপনাদের প্রেসিডেন্ট।’
বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়নের পথ কঠিন হয়ে উঠবে। গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সমর্থন আদায় করতে হবে তাঁকে। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়জুড়ে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিরোধী দলের চাপ মোকাবিলা করেই এগোতে হতে পারে।



