মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, মালিকপক্ষের অনীহা, সরকারের বিলম্বিত উদ্যোগ, শ্রমিকদের ক্ষোভ এবং আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ—সব মিলিয়ে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দাবি আদায়ের আন্দোলন কেন সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে রূপ নিচ্ছে? সহিংসতার দায় কি কেবল শ্রমিকদের, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা? সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে আসে বহুমাত্রিক দায়ের চিত্র।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এ খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও এই শিল্পকে ঘিরে। অথচ সেই শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ যখন সড়কে গড়ায়, তখন তা শুধু একটি শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। ৩ নভেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে। কয়েক শ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
রয়টার্স, এএফপি, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অস্থিরতার পেছনে যেমন শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মালিকপক্ষ, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আন্দোলনের সুযোগ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা। ফলে সহিংসতার দায় নির্ধারণ করতে হলে ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
মজুরির অসন্তোষই কি সংকটের মূল?
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এরপর খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও চিকিৎসাসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।
দ্য ডেইলি স্টারের ৩ নভেম্বরের প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের একজন শ্রমিকের বক্তব্য উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা, অথচ বাড়িভাড়াতেই খরচ হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতে প্রয়োজন আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই হিসাব একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলেও বৃহত্তর শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—একজন শ্রমিক মাসের পর মাস কাজ করেও যদি নিজের এবং পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে না পারেন, তাহলে তাঁর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়াটা কি অস্বাভাবিক? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল মালিকের সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
অতএব, শ্রমিকদের বিক্ষোভের পেছনে যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, সেটিকে অস্বীকার করে কেবল বিশৃঙ্খলা হিসেবে আন্দোলনকে চিহ্নিত করলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাবে।
মালিকপক্ষের দায় কতটা?
পোশাকশিল্পের মালিকদের যুক্তিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্য, ক্রয়াদেশের চাপ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের দাম কম পাওয়ার মতো বাস্তব সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে হঠাৎ করে মজুরি দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হতে পারে।
কিন্তু ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের যুক্তিতে শ্রমিকের জীবনযাত্রার সংকটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিল্পের মুনাফা, রপ্তানি আয় ও প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও বিবেচনায় নিতে হবে।
একটি শিল্পের সাফল্য শুধু কত ডলারের পণ্য রপ্তানি হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই শিল্পে কর্মরত মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, তাঁদের আয় দিয়ে পরিবার চলে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পান কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মালিকপক্ষ যদি শ্রমিকদের অসন্তোষের বিষয়টি আগেভাগে গুরুত্ব দিত এবং নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে মজুরি ও অন্যান্য দাবি নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করত, তাহলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারত। শ্রমিকদের দাবি যৌক্তিক কি না, কতটুকু মজুরি বাড়ানো সম্ভব—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন ছিল।
তাই সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার দায় মালিকদের ওপর চাপানো যাবে না, কিন্তু দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে তাঁদের ভূমিকা ও দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারের বিলম্বিত উদ্যোগ ও সমন্বয়হীনতা
এই সংকটে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে তা নিরসনের জন্য কার্যকর মধ্যস্থতা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং ন্যায্য মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান আন্দোলনের মধ্যে ১ নভেম্বর সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে শ্রমিক, মালিক, সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্ব রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। প্রশ্ন হলো, শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে অসন্তোষ যখন দীর্ঘদিনের, তখন আন্দোলন সড়কে ছড়িয়ে পড়ার পরই কেন কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলো?
একটি কার্যকর শ্রমনীতি থাকলে মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকার কথা। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মজুরির সামঞ্জস্য নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের দাবি সড়কে আসার পর সরকারের তৎপরতা শুরু হওয়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
সরকারের আরেকটি দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও জনসম্পদের ক্ষতি প্রতিরোধ করা। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
সহিংসতার দায় কি আন্দোলনকারীদের?
আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকলেও সহিংসতার কোনো বৈধতা নেই। শ্রমিকদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অর্থ কারখানা ভাঙচুর, যানবাহনে আগুন, পুলিশের ওপর হামলা কিংবা জনসাধারণের চলাচল বন্ধ করে দেওয়াকে সমর্থন করা নয়।
দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমিকদের একাংশ পুলিশ ও কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। গাজীপুরে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সাভার ও আশুলিয়ায় কয়েকটি কারখানায় হামলা এবং নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। মিরপুরেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শ্রমিক আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন শ্রমিকেরাই। উৎপাদন বন্ধ হলে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব শ্রমিককে সহিংসতার জন্য দায়ী করা যাবে না। শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো শ্রমিক এবং পরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের এক করে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তির অপরাধের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।
তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ: বাস্তবতা, নাকি দায় এড়ানোর যুক্তি?
চলমান অস্থিরতায় তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগও সামনে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন আন্দোলনে বহিরাগতদের উসকানি ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির বাইরে গিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আন্দোলনে সাবেক ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ৩৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। এর আগে ২ নভেম্বর পুলিশ একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে তথ্য দেয়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, আন্দোলনে বহিরাগত বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কোনো গোষ্ঠী সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে ব্যবহার করে কেউ যদি কারখানায় অগ্নিসংযোগ, নাশকতা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগ দিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষকে অস্বীকার করা যাবে না। পুলিশের বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক অভিযোগই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কারা নাশকতা করেছে, কারা উসকানি দিয়েছে এবং কারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
প্রমাণ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ওপর সামগ্রিক দায় চাপালে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংযম, পেশাদারত্ব ও আনুপাতিক শক্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ৫৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদেরও অনেকে আহত হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করেছে।
পুলিশের ওপর হামলা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হলে তা নতুন ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। কোনো এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে কারা প্রথম হামলা করেছে, পুলিশ কী পরিস্থিতিতে শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা মানে শুধু সড়ক থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে শ্রমিকেরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন এবং মালিকেরা নির্বিঘ্নে উৎপাদন চালাতে পারবেন।
সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে দেশ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প শুধু ব্যবসায়িক খাত নয়, জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। চলমান অস্থিরতায় কয়েক শ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ৩০০টির বেশি কারখানায় ছুটি বা উৎপাদন স্থগিতের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিক, ক্ষুদ্র সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন বন্ধ থাকলে ক্রয়াদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে।
তবে রপ্তানি আয় রক্ষার যুক্তিতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক। কারণ শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতি ছাড়া শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সমাধান কোথায়?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডকে দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, পরিবহন ও পরিবারের মৌলিক ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মালিকপক্ষের নিয়মিত সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য কারখানাভিত্তিক কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যাতে দাবি আদায়ের জন্য সড়কে নামার আগেই সমস্যার সমাধান করা যায়।
তৃতীয়ত, সহিংসতার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা কিংবা উসকানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করলে তাঁর বিরুদ্ধেও তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিশ্চয়তা ও নিয়মিত বেতন পরিশোধের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মজুরি বাড়ালেই শ্রমিক অসন্তোষের সব কারণ দূর হবে না।
দায় এক পক্ষের নয়, তবে অপরাধের দায় ব্যক্তির
পোশাকশ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য একজন বা একটি পক্ষকে এককভাবে দায়ী করা বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ, মালিকপক্ষের কার্যকর সমাধানে ঘাটতি, সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগের অভাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং আন্দোলনের মধ্যে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ—সবকিছুই সংকটের বিভিন্ন মাত্রা।
তবে এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি: শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে ব্যর্থতার দায় প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত; কিন্তু অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, হামলা ও নাশকতার দায় প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। একটির দায় দিয়ে অন্যটির দায় আড়াল করা যাবে না।
সরকার যদি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেয়, কিন্তু শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকটের সমাধান না করে, তাহলে অস্থিরতা আবারও ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন যদি সহিংসতার পথে পরিচালিত হয়, তাহলে তাঁদের ন্যায্য দাবিও জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
মালিকদেরও বুঝতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি উৎপাদনব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। একইভাবে শ্রমিকদেরও বুঝতে হবে, যে কারখানা তাঁদের জীবিকার উৎস, সেটি ধ্বংস করার মধ্যে কোনো অর্জন নেই।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে এখন প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, বরং ন্যায়সংগত মজুরি, দায়িত্বশীল মালিকানা, জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় মধ্যস্থতা। কারণ শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের স্থিতিশীলতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং একটির সুরক্ষার মধ্য দিয়েই অন্যটির টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হতে পারে।
ম. হামিদুল হক মানিক, কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন



