রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণশুনানিতে বসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে এলপিজি বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ের দামে পড়তে পারে।
২০২১ সালের এপ্রিলে মাসভিত্তিক এলপিজির দাম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালুর পর এই প্রথম ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি করতে যাচ্ছে বিইআরসি। চলতি মাসের শুরুতে ব্যবসায়ীরা কমিশন বৃদ্ধির আবেদন করার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। গত সেপ্টেম্বরে বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। পরে গত ৪ অক্টোবর এক ধাপে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে সিলিন্ডারপ্রতি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে খুচরা বাজারে দাম এখনো ২ হাজার ২০০ টাকার ওপরে। দেশের এক কোটিরও বেশি এলপিজি গ্রাহকের অনেককেই একটি সিলিন্ডারের জন্য বর্তমানে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে অন্তত ১০ জন গ্রাহক, ছয়জন খুচরা বিক্রেতা, দুজন পরিবেশক ও দুজন আমদানিকারকের সঙ্গে কথা বলে বাজারে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির এ চিত্র পাওয়া গেছে।
নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের ব্যবধান
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার পরিবেশকদের কাছে ১ হাজার ৭৪২ টাকায় বিক্রি করবে। এর সঙ্গে পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় বাবদ ৫০ টাকা যোগ করে পরিবেশকদের খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সিলিন্ডারটি ১ হাজার ৭৯২ টাকায় বিক্রির কথা। এরপর খুচরা বিক্রেতার ৪৫ টাকা কমিশন যুক্ত হলে গ্রাহক পর্যায়ে সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিবেশকেরা কোম্পানিভেদে প্রতিটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ টাকার বেশি দামে কিনছেন। এরপর নির্ধারিত ৫০ টাকা কমিশনের পরিবর্তে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা রেখে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে অন্তত ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছেন। পরবর্তী পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতারাও নির্ধারিত কমিশনের চেয়ে বেশি মুনাফা যোগ করে গ্রাহকদের কাছে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের
গত ১৩ অক্টোবর ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের চারজন পরিবেশক বিইআরসির কাছে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেন। আবেদনে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি, আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ না করে মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয় করে। এতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদেরও বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে এবং বিক্রি করতে হয়। ফলে নির্ধারিত কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার এক এলপিজি পরিবেশক জানান, নিয়ম অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর পরিবেশকদের গুদামে ১ হাজার ৭৪২ টাকা দরে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানে না। নিজস্ব পরিবহনে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে সিলিন্ডার পেতেও দুই থেকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়।
ওই পরিবেশকের ভাষ্য, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, ওমেরা, বিএম, টোটাল ও আইগ্যাসের মতো কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে এলপিজির নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা এবং সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই আজকের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে বিইআরসির সিদ্ধান্ত কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী মূল্যকাঠামো নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ কতটা বাড়বে।



