মধু বড়দের জন্য পুষ্টিকর ও প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে পরিচিত হলেও এক বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে এটি হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। বিশেষজ্ঞরা তাই ১২ মাস পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুকে মধু না দেওয়ার পরামর্শ দেন। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো ইনফ্যান্ট বোটুলিজম নামের বিরল কিন্তু গুরুতর একটি অসুস্থতার আশঙ্কা।
মধুতে কখনো কখনো ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক ও তুলনামূলক বড় শিশুদের পরিপাকতন্ত্র সাধারণত এসব স্পোরের বিস্তার ঠেকাতে সক্ষম। কিন্তু এক বছরের কম বয়সি শিশুর অন্ত্র তখনও পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
মধুর মাধ্যমে স্পোর শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে তা অন্ত্রে বেড়ে গিয়ে বোটুলিনাম নিউরোটক্সিন তৈরি করতে পারে। এই বিষ স্নায়ু ও পেশির মধ্যে স্বাভাবিক সংকেত আদান-প্রদানে বাধা দেয়। এর ফল হিসেবে শিশুর শরীরে ধীরে ধীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
অবশ্য সব মধুতেই বোটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকবে, এমন নয়। একইভাবে মধু খাওয়া প্রতিটি শিশুরই বোটুলিজম হবে—এমনটিও নয়। রোগটি বিরল। তবে এক বছরের কম বয়সি শিশুর জন্য মধু অপরিহার্য কোনো পুষ্টির উৎসও নয়। তাই সামান্য সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণটিও এড়াতে এ বয়সে মধু না দেওয়াই নিরাপদ।
মধুর মিষ্টতা নয়, মূল উদ্বেগ ব্যাকটেরিয়ার স্পোর
অনেকে মধুকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা শিশুর সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী মনে করেন। কিন্তু এক বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে সমস্যাটি মধুর চিনি বা মিষ্টি স্বাদ নয়। বরং মধুর মধ্যে থাকতে পারে এমন ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম স্পোরই মূল উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শিশুদের বোটুলিজম নিয়ে চিকিৎসা ও গবেষণা চলছে। Pediatrics জার্নালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮টি দেশে ২০০৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইনফ্যান্ট বোটুলিজমের ২ হাজার ৯৪৩টি নিশ্চিত ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, একাধিক ধরনের ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেন এ রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। তবে টাইপ এ ও টাইপ বি বোটুলিনাম টক্সিনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ছিল।
গবেষকদের মতে, ইনফ্যান্ট বোটুলিজম নিয়ে বিশ্বের অনেক জায়গাতেই পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। একই সঙ্গে রোগ শনাক্ত করার সীমিত সক্ষমতার কারণে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়া সংখ্যার তুলনায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
শুরুতে যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ইনফ্যান্ট বোটুলিজমের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য অনেক সময় প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। এরপর শিশুর পেশিশক্তি কমতে শুরু করলে একের পর এক শারীরিক সমস্যা প্রকাশ পেতে পারে।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- বুকের দুধ বা খাবার খেতে অসুবিধা
- স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল কান্না
- মুখের নড়াচড়া কমে যাওয়া
- চোখের পাতা ঝুলে পড়া
- মাথা ধরে রাখতে না পারা
- গিলতে অসুবিধা
বিষক্রিয়া বাড়লে গিলতে ও শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত পেশিগুলোও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করে শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই এক বছরের কম বয়সি শিশুর মধ্যে হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা, খাওয়াতে সমস্যা, দুর্বল কান্না, কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে সহজ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলো—শিশুর বয়স এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মধু সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা।



