বাংলাদেশের ইতিহাসকে উপমহাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন সম্পাদক ও কবি মারুফ কামাল খান। তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের ঘটনাও ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনের এনআরসি সেন্টারে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘দি আর্কিটেক্ট রিমেম্বার্ড’ স্মরণ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মারুফ কামাল খান বলেন, বাঙালি কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয় এবং এই অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাসের একটি বড় অংশের উত্তরাধিকার বহন করছে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, একসময় এই অঞ্চলের মানুষের একটি অংশ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। সে সময়ই তাকে ‘কায়েদে আজম’ বা মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব ও জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক বলেন, উপমহাদেশের ইতিহাসে জিন্নাহর ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে প্রচলিত বয়ান তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তার মতে, উপমহাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা প্রয়োজন।
মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ আয়োজিত এই স্মরণ উৎসবে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান। সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন প্রফেসর লে. কর্নেল (অব.) আকরাম আলী, ডা. ফরিদ উদ্দীন, ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম ও অ্যাডভোকেট মোস্তফা জামাল চৌধুরীসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠানে জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক তামিমা জোবায়দা ‘রিক্লেইমিং জিন্নাহ’ শিরোনামে একটি কনসেপ্ট পেপার উপস্থাপন করেন। তিনি চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তামিমা জোবায়দা বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক কাঠামোর পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে মুসলিম জাতীয়তা, গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তরুণদের কাছে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন পাকিস্তানের যুব মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ কামরান সাঈদ উসমানী। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দিন।
স্মরণ উৎসবে আরও উপস্থিত ছিলেন মেজবাহ উদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, মিনহাজুল আবেদিন শরীফ, শাহ নাজমুল হাসান ফেরদাউস, গালীব ইহসান, তৌহিদ তপু, মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, আবদুল ওয়াহেদ, জিহাদী ইহসান ও মো. আরিফুল ইসলামসহ অনেকে।
তিন দিনের আয়োজনের প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পুরানা পল্টনের এনআরসি সেন্টারে জিন্নাহকে নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সমাপনী দিনে বাদ জুমা জিন্নাহর সহযোদ্ধাদের জাতীয় তিন নেতার মাজার জিয়ারত করা হবে। পরে বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে দোয়া মাহফিল।



