ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও তাদের গতিবিধি অনুসরণের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে। ব্যবহারকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা কিংবা তাদের ওপর নজরদারি চালানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে অবগত ছয় ব্যক্তি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জাপানের টোকিওভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষকরা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক কার্যক্রমের সন্ধান পান। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে ডিসকভার-টেক অন্যতম সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, শতাধিক দেশে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট ট্রাফিকের বিপরীতে বিজ্ঞাপন কেনার দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ অবস্থানে ছিল। এসব দেশের মধ্যে এমন কয়েকটি দেশও রয়েছে, যেখানে স্টারলিংক সেবা নিষিদ্ধ কিংবা সীমিত।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের আড়ালে নজরদারির আশঙ্কা
অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্য বিজ্ঞাপনদাতারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও অ্যাপে বিজ্ঞাপনের জায়গা পেতে স্বয়ংক্রিয় নিলামপ্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীদের ব্রাউজিং কার্যক্রম ও ডিভাইসসংক্রান্ত কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন কেনার দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছাতে পারে।
ট্রেন্ডএআই গত ১৫ অক্টোবর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সেখানে ডিসকভার-টেকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিবেদনে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তির দাবি, এটি ডিসকভার-টেকের জন্য ট্রেন্ডএআইয়ের ব্যবহৃত সাংকেতিক নাম।
প্রতিবেদনে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করার কারণ জানতে চাইলে ট্রেন্ডএআই জানায়, ভুলভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করার ঝুঁকি কমানো এবং বিভ্রান্তিকর পরিচিতি এড়ানোর জন্য তারা এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে। ভুল পরিচিতি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করতে পারে, ঝুঁকি মূল্যায়নের অগ্রাধিকার বদলে দিতে পারে এবং অনুপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হতে পারে বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তথ্য ব্যবহার করে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণের কৌশল খোঁজা এখন একটি বিশেষায়িত শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
জাতীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর পরিবর্তে স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে। ফলে এই সেবা ব্যবহার করে স্থানীয় ইন্টারনেট বিধিনিষেধ এড়িয়ে যোগাযোগ করা, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংযুক্ত থাকা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক তৎপরতা সমন্বয় করা সম্ভব হয়।
ইউক্রেনের জন্য স্টারলিংক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সামরিক বাহিনী সম্মুখসারিতে যোগাযোগ রক্ষা এবং ড্রোন হামলা পরিচালনার কাজে এ সেবার ওপর নির্ভর করে।
গত মে মাসে ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজ ও ওয়েবসাইট ইন্টেলিজেন্স অনলাইন পৃথক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরাইলি মালিকানাধীন কিছু প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণের কৌশল সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে তুলে ধরছিল। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের কাজে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
বৃহত্তর নজরদারি কার্যক্রমের অভিযোগ
ট্রেন্ডএআইয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই কানাডার সাইবার নিরাপত্তা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কনফিয়্যান্ট পৃথক তদন্তের ফল প্রকাশ করে। উভয় প্রতিষ্ঠানই তাদের প্রতিবেদনে ডিসকভার-টেকের নাম উল্লেখ করে।
তাদের অভিযোগ, ডিসকভার-টেক ডিজিটাল বিজ্ঞাপন কেনার স্বয়ংক্রিয় নিলামপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার করেছে। এ প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন কেনার দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রকাশিত হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে এসব তথ্য সংগ্রহ, একত্র করা এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে অনলাইনে ব্যবহারকারীদের গতিবিধি অনুসরণ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য করে নজরদারি সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়্যান্টের তদন্তে বলা হয়, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন সংবাদমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিসহ কয়েক ডজন সংবেদনশীল নেটওয়ার্কে প্রদর্শিত হয়েছিল।
তদন্তের পর গুগল, কমকাস্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা নিজেদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে সরিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি তাদের কর্মীদের লক্ষ্য করে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।
ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে বিজ্ঞাপন কেনায় শীর্ষে
ট্রেন্ডএআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপন কেনার ধরন থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তাদের কার্যক্রম সাধারণ বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারের চেয়ে ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা ও তাদের গতিবিধি অনুসরণের অবকাঠামো পরিচালনার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অস্বাভাবিক সক্রিয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বলা হয়, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ অবস্থানে ছিল। আফগানিস্তানে ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কিংবা সক্রিয় সংঘাত চলছে—এমন দেশগুলোতে বৈধ পশ্চিমা বিজ্ঞাপনের চাহিদা খুবই সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে এসব দেশে প্রতিষ্ঠানটির বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞাপনের দরপত্র জেতার বিষয়টি সন্দেহ তৈরি করেছে।
হাঙ্গেরি, ইসরাইল, মিসর, আজারবাইজান ও ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশেও প্রতিষ্ঠানটি অস্বাভাবিক হারে দরপত্র জিতেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয় ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষকরা সন্দেহজনক দরপত্র কার্যক্রমের পেছনে ডিসকভার-টেকের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হবে কি না, তা নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। তবে ট্রেন্ডএআইয়ের নির্বাহীরা আইনি ঝুঁকির বিষয়টি উত্থাপন করার পর শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে নাম উল্লেখ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে পাঁচজন জানিয়েছেন।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক
শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা খাতে কোনো সন্দেহভাজন পক্ষের নাম প্রকাশ না করার ঘটনা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে কোনো নজরদারি কার্যক্রম প্রকাশ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় সরাসরি দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকে।
এর আগে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পালো অল্টো নেটওয়ার্কস বৈশ্বিক সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির একটি অভিযান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে চীনের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করা বক্তব্য বাদ দিয়েছিল। যদিও সে সময় রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পালো অল্টোর গবেষকরা হামলার পেছনে বেইজিংয়ের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন।
রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনের নাম সরাসরি উল্লেখ করলে দেশটিতে পালো অল্টোর ব্যবসায় সমস্যা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রতিবেদনটির ভাষা নরম করা হয়েছিল। এর আগে চীনা কর্তৃপক্ষ দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে পালো অল্টোর পণ্য ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছিল এবং কোম্পানিটির কার্যক্রম পর্যালোচনার আওতায় ছিল।
তবে পালো অল্টো জানিয়েছিল, প্রতিবেদনে সরাসরি দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ না করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে চীনের ক্রয়সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো দাবি ‘অনুমাননির্ভর ও অসত্য’ বলেও উল্লেখ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।



