মাথাব্যথা, দাঁতের যন্ত্রণা কিংবা শরীরের অন্য কোনো স্থানে ব্যথা দেখা দিলেই অনেকেই ব্যথানাশক ওষুধের আশ্রয় নেন। দ্রুত স্বস্তি মিললেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত এসব ওষুধ সেবন কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, পাকস্থলীতে আলসার এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ব্যথা কমাতে পরিচিতজনের পরামর্শে ওষুধ খাওয়া কিংবা আগের ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু সব ব্যথার জন্য একই ওষুধ উপযুক্ত নয়। ওষুধের ধরন, সেবনের মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর এর নিরাপত্তা নির্ভর করে। তাই সামান্য ব্যথা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে পেইনকিলার খাওয়ার অভ্যাস থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ব্যথানাশক ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
১. কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে
আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক ও ন্যাপ্রোক্সেনের মতো কিছু ব্যথানাশক কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকে কিডনির সমস্যা রয়েছে, শরীরে পানির ঘাটতি আছে কিংবা বয়স বেশি—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
২. অতিরিক্ত প্যারাসিটামলে লিভারের ক্ষতি
নির্দেশিত মাত্রায় প্যারাসিটামল সাধারণত নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত সেবনে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণ করলে অজান্তেই নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করার আশঙ্কা থাকে।
৩. পাকস্থলীতে আলসার ও রক্তক্ষরণ
কিছু ব্যথানাশক পাকস্থলীর সুরক্ষামূলক আবরণকে দুর্বল করে দিতে পারে। দীর্ঘদিন কিংবা বেশি মাত্রায় এসব ওষুধ সেবনের ফলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে আলসার তৈরি হওয়া এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৪. রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের জটিলতা
নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) শ্রেণির কিছু ওষুধ রক্তচাপ বাড়াতে এবং শরীরে অতিরিক্ত তরল জমাতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এগুলো হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
৫. ওষুধের কারণে মাথাব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া
ঘন ঘন ব্যথানাশক ব্যবহারের ফলে উল্টো মাথাব্যথার সমস্যা বাড়তে পারে। একে মেডিকেশন-ওভারইউজ হেডেক বলা হয়। ফলে ব্যথা কমানোর জন্য নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার অভ্যাসই নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
৬. অন্য ওষুধের সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া
কিছু ব্যথানাশক রক্ত পাতলা করার ওষুধ, নির্দিষ্ট রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ কিংবা অন্য ব্যথানাশকের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও জটিলতার আশঙ্কা বাড়ে। তাই একাধিক ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণের আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যাদের ব্যথানাশক ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
কিডনি বা লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপের রোগী, হৃদ্রোগে ভোগা মানুষ, পাকস্থলীর আলসার রয়েছে এমন রোগী এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের ব্যথানাশক ব্যবহারে বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত। গর্ভাবস্থায়ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।
ব্যথানাশক খাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- সামান্য ব্যথা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ সেবন করবেন না।
- ওষুধের প্যাকেটে উল্লেখিত নির্দেশনা মেনে চলুন এবং নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করবেন না।
- একই সক্রিয় উপাদান রয়েছে এমন একাধিক ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।
- বারবার ব্যথা হলে শুধু ওষুধের মাধ্যমে তা কমানোর চেষ্টা না করে মূল কারণ খুঁজে বের করুন।
- দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে?
ব্যথানাশক সেবনের পর রক্তবমি, কালো পায়খানা, প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা মুখ ও গলা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। অতিরিক্ত প্যারাসিটামল খেয়ে ফেললে কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
ব্যথানাশক ওষুধ মানেই ক্ষতিকর নয়। সঠিক ওষুধ উপযুক্ত মাত্রায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সামান্য অস্বস্তি হলেই নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ব্যথার কারণ শনাক্ত করা, ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ থাকার নিরাপদ উপায়।



