জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে জি-৪ জোট। ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান নিয়ে গঠিত এই জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় তার মূল দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে পারছে না।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে জি-৪-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। এতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ডেভিড ওয়াডেফুল এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসু অংশ নেন। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এক যৌথ বিবৃতিতে জি-৪ বলেছে, বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। তাদের মতে, প্রায় ৮০ বছর আগে গড়ে ওঠা বর্তমান কাঠামো আজকের বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে না। এর ফলে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব, বৈধতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জি-৪-এর মতে, নিরাপত্তা পরিষদকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে স্থায়ী ও অস্থায়ী—উভয় ধরনের সদস্যপদ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জোটটি।
আলোচনায় আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জি-৪ ৮০তম অধিবেশনে আন্তঃসরকারি আলোচনা (আইজিএন) প্রক্রিয়ায় আফ্রিকান মডেল উপস্থাপনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্বসহ বৃহত্তর ভূমিকার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তারা।
তবে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার নিয়ে আইজিএন আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে জি-৪। জোটটির ভাষ্য, ১৮ বছর ধরে আলোচনা চললেও এখনো কাঙ্ক্ষিত বাস্তব ফল পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার নিয়ে লিখিত আলোচনা দ্রুত শুরু করাকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে তারা।
জি-৪-এর দাবি, বিভিন্ন দেশের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে একীভূত করে এমন একটি মডেল তৈরি করতে হবে, যাতে অধিকাংশ সদস্য দেশের মতামত প্রতিফলিত হয়। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮০তম অধিবেশনের আইজিএন আলোচনায় অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী—দুই ধরনের সদস্যপদ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে।
বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, জি-৪ বৈঠকে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অভিন্ন এই লক্ষ্য অর্জনে ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ডেভিড ওয়াডেফুলও নিরাপত্তা পরিষদে বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোতেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোর কণ্ঠ ও প্রতিনিধিত্ব আরও যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দেন তিনি।
জি-৪-এর চার দেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন চলাকালে নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে নিজ নিজ দেশের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক নয়াদিল্লিতে আয়োজন করে সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনার বিষয়ে একমত হয়েছে দেশগুলো।
এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডেফুলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। এতে ইউক্রেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংকট এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে ভারত-জার্মানি সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় হয়।



