ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া (এসআইআর) নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এর জেরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধীদের আন্দোলনও জোরালো হয়ে উঠেছে। দিল্লিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। একই সময়ে কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আয়োজিত সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছেন। সেখানে আয়োজন করা হয়েছে ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’ বা গণ-আদালতও।
বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে আয়োজিত সিজেপির সমাবেশে যুব ও তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ অংশ নেন। এ সময় ‘ভোট চোর’, ‘গোদি ছোড়’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, পথে নামুন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অংশ নিন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাকে নতুন একটি স্লোগান দিতেও দেখা যায়—‘এক… দুই… তিন… চার… নরেন্দ্র মোদি ভোট চোর’।
সিজেপির নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেওয়া হয়।
সমাবেশে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্রনেত্রী ঐশী ঘোষ, আইসার সভানেত্রী নেহা বোরা, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকসহ যুব ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি অংশ নেন।
সমাবেশে এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও ও মানুষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’ বা গণ-আদালতের। সেখানে কর্ণাটকের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের বা পরিচিতদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং এ নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
এরপর আয়োজিত হয় ‘চপ্পল প্রতিবাদ’ কর্মসূচিও।
এসআইআর বাতিলের দাবি প্রকাশ রাজের
ফ্রিডম পার্কের সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের আহ্বান জানান। তার অভিযোগ, বিষয়টি শুধু ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে নাগরিকদের মর্যাদা ও অধিকারও জড়িত।
অন্যদিকে ধ্রুব রাঠিও এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিজেপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে যেসব নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে এবং এসআইআর-পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা বহাল রাখতে হবে।
তাদের আরও দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
দিল্লিতে রাজঘাটে ইন্ডিয়া জোটের অবস্থান
এদিকে দিল্লিতে বুধবারের বিক্ষোভের পর বৃহস্পতিবার আন্দোলন আরও তীব্র করার ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। বুধবারের ঘটনাবলি এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণে বিরোধী দলের সাংসদরা বৃহস্পতিবার দুপুরে দিল্লির একটি ক্যাফেতে বৈঠক করেন। বৈঠকে পরবর্তী আন্দোলনের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে নেতারা বাসে করে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
রাজঘাটের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ইন্ডিয়া জোটের নেতারা রাজঘাটে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘শুভবুদ্ধির উদয়’ কামনা করে প্রার্থনা করা হবে, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারেন যে তাদের কর্মকাণ্ড দেশের স্বার্থের পরিপন্থি—এমন বক্তব্য দেন তিনি।
খাড়গে জানান, বিরোধী জোট ‘ভোট চুরি’, ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং যুবসমাজের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরবে। অধিকার ও স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার যে উদ্বেগ বিরোধী দলগুলোর রয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরার কথাও জানান তিনি।
রাহুল-প্রিয়াঙ্কার বিরুদ্ধে নতুন এফআইআর
বুধবারের বিক্ষোভের ঘটনায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশ সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, ধাক্কাধাক্কি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে এ মামলা করা হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন কংগ্রেস নেতা-কর্মীকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বুধবারের কর্মসূচিতে কয়েকজন সাংসদ ও নেতাসহ মোট ৯১ জনকে আটক করা হয়েছিল। ওই দিন রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ রাহুল গান্ধীসহ কয়েকজন সাংসদকে আটক করে।
‘দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন’
সিপিআই সাংসদ পি. সন্তোষ কুমার জানিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলো তাদের আন্দোলন আরও জোরদার করবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, ইন্ডিয়া জোটের আনুষ্ঠানিক অংশীদার না হওয়া সত্ত্বেও বিজু জনতা দল (বিজেডি)সহ বিভিন্ন বিরোধী দল আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি যুব ও ছাত্র সংগঠনও কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে।
সন্তোষ কুমারের দাবি, এই প্রতিবাদ এখন ‘জাতির প্রয়োজন’-এ পরিণত হয়েছে এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি
এদিকে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিরোধীদের করা আবেদনে সাড়া মিলেছে। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা গেছে।
সূত্রের খবর, বিরোধীদের পক্ষ থেকে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন জানানো হলেও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ১০ জনকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিনিধিদলে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকার কথা রয়েছে।
বিরোধীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের অভিযোগ তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।



