কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ পর্যটক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও প্রাণ হারিয়েছেন।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন ভেতরে থাকা পর্যটকেরা। কেউ দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন, আবার কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রিসোর্টের শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারও ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভী।
এ ছাড়া নিহত হয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা, নাফিসতা মীম, ফারিহা কবির ও পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফাইজান আহমেদসহ অন্যরা।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাফিজ তেহামী, নাবিলা, মালিহা ও আলভী পরস্পরের কাজিন। ফারিহা কবির ছিলেন নাফিজের বড় বোন। আর শিশু ফাইজান ছিল তাঁর ভাগ্নে। পরিবারের নয়জন সদস্য বেড়াতে গিয়ে ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
আশিকুল ইসলামের এক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগুন লাগার পর রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন আশিকুল। তবে তাঁর স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন। ওই স্বজন জানান, তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নাফিজ তেহামীসহ একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানান। শোক প্রকাশের পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
আহতদের মধ্যে চিকিৎসক ও তাঁর স্ত্রী
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় পাঁচ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের তিন ইউনিট
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহায়তা করে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
ঘটনার খবর পেয়ে উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
রিসোর্টটির ইনচার্জ মো. সুমন ইসলাম বলেন, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন জানান, ঘুম থেকে উঠে তিনি রিসোর্টটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি আগুনে পুড়ে যায়।
একই এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। আগুন লাগার পর কয়েকজন পর্যটককে জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে লাফ দিতে দেখা গেছে।
স্থানীয় যুবক ইউনুসের অভিযোগ, রিসোর্টটিতে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল না। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাক মিয়া বলেন, পর্যটন এলাকায় প্রায়ই ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে বড় ধরনের আগুন লাগলে উখিয়া থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে জেলা প্রশাসনের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি সম্ভাব্য দায়ও নির্ধারণ করা হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে প্রায় ২৯ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত রিসোর্টটির পুরো স্থাপনা আগুনে পুড়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।



