নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর নাম আসা এবং এমপির একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। একের পর এক ঘটনায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে এমপির ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে এমপির পদত্যাগের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের কথিত আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ ভিডিওটি নিয়ে বিদ্রূপও করছেন। এরই মধ্যে বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাস চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমপির ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার রাতে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামের জানাজা ও দাফনের পরপরই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আশফাক আহমেদ নামের এক প্রবাসীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে তিনটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করা হয়। পরে সেগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় পাঁচ মিনিটের ওই ভিডিওগুলোতে আব্দুল আজিজকে এক নারীর সঙ্গে স্পর্শকাতর কথোপকথন ও বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ ভিডিওটিকে মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে আশফাক আহমেদের ওই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আব্দুল আজিজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং তাঁর দুই ছেলেকে ঘিরে নানা অভিযোগের সমালোচনা করা হচ্ছিল। এর মধ্যেই ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ড এবং মামলায় এমপির ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর নাম সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হত্যা মামলায় এমপিপুত্র তিন দিনের রিমান্ডে
গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২) সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার ১২ দিন পর গত সোমবার রাত ৮টার দিকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। শাকিল হত্যাকাণ্ডে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর দলীয় পদ থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে জানানো হয়, জীবনহানির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। একই সঙ্গে সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানাজায় এমপির বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হয়।
দ্বিতীয় জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এমপি আব্দুল আজিজ নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে তাঁর বক্তব্যের সময় উপস্থিত বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। এতে জানাজাস্থলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানাজা শেষে চাঁচকৈড় বাজারের রাশ আরবান মেগা শপিং মলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পদত্যাগের দাবি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের
এমপির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন। হত্যা মামলা, দলীয় বহিষ্কার, পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার এবং ভিডিও বিতর্ক—সব মিলিয়ে নাটোরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয় ছাত্রদল সূত্রের দাবি, এমপি আব্দুল আজিজের দুই ছেলের পৃথক সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধও রয়েছে। নিহত শাকিল ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে, নুরুজ্জামান মিন্টু উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সোহাগও উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন শাকিল
শাকিলের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। গত ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কথাও জানিয়েছিলেন।
শাকিলের বাবা রবিউল করিমের অভিযোগ, তাঁর ছেলের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। এমনকি শাকিল হামলার শিকার হওয়ার পরও হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে শাকিলের ওপর হামলা চালায় হেলমেট পরা দুই যুবক। তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায় তারা। পরে তাঁকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে রাজশাহী এবং পরে ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গুরুদাসপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এরপর জানাজায় এমপির বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা এবং তাঁর কথিত আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
সব মিলিয়ে ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলা ও এমপি আব্দুল আজিজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নাটোরের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করেছে। মামলার তদন্ত, ভিডিওটির সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ওপর এখন পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে।



