tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকক্যানসার গবেষণায় নিবেদিত জীবন, শেষ পর্যন্ত সেই রোগেই মৃত্যু ড. রচনা শ্রফের

ক্যানসার গবেষণায় নিবেদিত জীবন, শেষ পর্যন্ত সেই রোগেই মৃত্যু ড. রচনা শ্রফের

ক্যানসার চিকিৎসা ও গবেষণায় দীর্ঘদিন অবদান রাখা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. রচনা শ্রফ আর নেই। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে টার্মিনাল অ্যাডেনোকার্সিনোমায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়জুড়ে যে রোগের চিকিৎসা উন্নত করা এবং আক্রান্তদের সুস্থতার পথ খুঁজতে কাজ করেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই ক্যানসারের সঙ্গেই তাকে লড়াই করতে হয়েছে।

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যানসার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই চিকিৎসকের মৃত্যু সহকর্মী ও চিকিৎসা অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

চিকিৎসা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান

ড. রচনা শ্রফ ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসক-বিজ্ঞানী এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অনকোলজি বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে অগ্ন্যাশয় ও পিত্তনালির ক্যানসারের চিকিৎসায় তার উল্লেখযোগ্য দক্ষতা ও অবদান ছিল।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের প্রধান হওয়ার পাশাপাশি অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটি ক্যানসার সেন্টারের ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশনের সহযোগী পরিচালক এবং মেডিসিনের অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অনকোলজিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রথম ‘জন এফ. অ্যান্ড ভাল্লি এস. ডুভাল এনডাউড প্রফেসর’ হিসেবে মনোনীত হন। এ ছাড়া কলেজ অব মেডিসিন-টাসসনের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল রিসার্চের সহযোগী ডিনের দায়িত্বও সামলেছেন।

গবেষণাক্ষেত্রে তার অবদান ছিল বিস্তৃত। তিনি ৮০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন এবং জটিল ও বিরল ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের লক্ষ্যে একাধিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (অ্যাসকো) এবং তার সহকর্মীরা তাকে একজন মানবিক চিকিৎসক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে স্মরণ করছেন। রোগীদের জীবনমান উন্নত করা এবং ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে তার নিরলস প্রচেষ্টা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের পথচলা

ড. শ্রফ ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে থমাস জেফারসন ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। ২০১০ সালে টেক্সাস ইউনিভার্সিটির এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারে ফেলোশিপ সম্পন্ন করার পর সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির জিআই মেডিকেল অনকোলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এরপর ২০১৮ সালে টাসসনে ফিরে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে চিকিৎসা, গবেষণা ও একাডেমিক নেতৃত্বের মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

যেভাবে শনাক্ত হয় মরণব্যাধি

চলতি বছরের শুরুর দিকে নিজের শরীরে একটি লিম্ফ নোড ফুলে থাকতে দেখে চিকিৎসা নেওয়ার পর ক্যানসারের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত লড়াই শুরু হয়।

প্রথম দিকে চিকিৎসকেরা এটিকে লিম্ফোমা বলে সন্দেহ করেছিলেন। তবে পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায়, রোগটি ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত তার টার্মিনাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা শনাক্ত হয়। এ ধরনের ক্যানসার সাধারণত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অভ্যন্তরীণ আবরণে থাকা গ্রন্থিযুক্ত কোষ থেকে সৃষ্টি হয়। রোগটির অগ্রসর পর্যায়ের কারণে তার চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বামী-সন্তান রেখে গেলেন ড. শ্রফ

কর্মজীবনে অসামান্য সাফল্যের পাশাপাশি পরিবারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ড. রচনা শ্রফের। মৃত্যুকালে তিনি ১৩ বছর বয়সি ছেলে শচীন এবং ১৭ বছর বয়সি মেয়ে সিমরনকে রেখে গেছেন।

তার স্বামী ডা. পুনিত শ্রফ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি ব্যানার মেডিকেল গ্রুপের অ্যালার্জি ক্লিনিকের সহযোগী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ক্যানসার চিকিৎসায় তার গবেষণা, রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান সহকর্মী ও গুণগ্রাহীদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।