মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পরও অনেকেরই মাস শেষ হওয়ার আগেই অর্থসংকটে পড়তে হয়। বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যাতায়াত, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। ফলে মাসের শেষ দিকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আয় সীমিত হলেও সঠিক পরিকল্পনা, খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য আয় অনুযায়ী বাজেট তৈরি করার পাশাপাশি অর্থ ব্যয়ের ধরনও পর্যালোচনা করা জরুরি। জেনে নেওয়া যাক, কম আয়ে মাসের খরচ সামলানোর সাতটি কার্যকর উপায়।
১. প্রতিটি আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখুন
আর্থিক ব্যবস্থাপনার শুরুতেই জানতে হবে, মাসে কত টাকা আয় হচ্ছে এবং কোন কোন খাতে তা ব্যয় হচ্ছে। বেতনের পাশাপাশি অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ এলে সেটিও মোট আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এরপর প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুন। চা-নাশতা, যাতায়াত কিংবা ছোটখাটো কেনাকাটার মতো ব্যয়ও হিসাবের বাইরে রাখা উচিত নয়। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য নিয়মিত খরচের পাশাপাশি বাজার, চিকিৎসা এবং মোবাইল রিচার্জের খরচও নথিভুক্ত করুন।
এ জন্য কাগজের খাতা, মোবাইলের নোট অ্যাপ অথবা স্প্রেডশিট ব্যবহার করা যেতে পারে। এক মাসের হিসাব পর্যালোচনা করলেই অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং সাশ্রয়ের সুযোগগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।
ব্যয়কে দুই ভাগে ভাগ করে হিসাব রাখাও কার্যকর। বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতনের মতো নির্ধারিত খরচ একদিকে রাখুন। অন্যদিকে নিত্যপণ্য, যাতায়াত ও চিকিৎসার মতো পরিবর্তনশীল ব্যয়ের হিসাব রাখুন।
২. বিলাসিতার আগে প্রয়োজনীয় খরচ নিশ্চিত করুন
বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে প্রচলিত একটি পদ্ধতি হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। এতে মোট আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচ, ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত পছন্দ ও বিনোদন এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় বা ঋণ পরিশোধের জন্য রাখার কথা বলা হয়।
তবে কম আয়ের মানুষের পক্ষে এই অনুপাত অনুসরণ করা সব সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বাড়িভাড়া ও খাবারের খরচ বেশি হলে আয়ের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ৬০/৩০/১০ কিংবা ৭০/২০/১০ অনুপাতের মতো বিকল্প বিবেচনা করা যায়। কোন অনুপাত উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করবে ব্যক্তির আয়, পারিবারিক দায়িত্ব ও নিয়মিত ব্যয়ের ওপর।
একবারে বড় অঙ্কের সঞ্চয় করতে না পারলেও হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য অনুযায়ী আয়ের ৫ শতাংশ সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধীরে ধীরে সেই পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
৩. ছোট-বড় অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে লাগাম টানুন
প্রতিদিনের সামান্য খরচও মাস শেষে বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে। তাই কোথায় অল্প খরচ কমিয়ে কিছু অর্থ বাঁচানো সম্ভব, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
যেসব সাবস্ক্রিপশন বা অনলাইন সেবা ব্যবহার করা হয় না, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত বাইরে খাওয়ার পরিবর্তে ঘরে খাবার তৈরি করলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় কমানো সম্ভব। একইভাবে প্রয়োজন নেই এমন পণ্য কেনার আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় নেওয়া ভালো। বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার ক্ষেত্রে ৩০ দিন অপেক্ষা করার অভ্যাস তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন ফি, সার্ভিস চার্জ এবং অন্যান্য ছোট অঙ্কের খরচও খেয়াল রাখতে হবে।
তবে শুধু চা-নাশতা বা ছোটখাটো কেনাকাটার ব্যয় কমিয়ে সব সময় উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় করা সম্ভব হয় না। তাই বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য বড় ব্যয়ের বিষয়েও নজর দেওয়া জরুরি। এসব খাতে পরিবর্তনের সুযোগ থাকলে সেখান থেকে তুলনামূলক বেশি অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
৪. বিপদের সময় কাজে লাগবে এমন তহবিল তৈরি করুন
হঠাৎ অসুস্থতা, বাসার জরুরি মেরামত কিংবা চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতিতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। আগে থেকে সঞ্চয় না থাকলে এসব ব্যয় মেটাতে ঋণ বা ধার করার ওপর নির্ভর করতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি তহবিল গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ জমা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য শুরুতেই এত টাকা জমানো কঠিন হতে পারে।
তাই প্রথমে ছোট একটি লক্ষ্য ঠিক করুন। যেমন, জরুরি চিকিৎসা বা হঠাৎ প্রয়োজনীয় কোনো ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ জমিয়ে রাখা। এরপর আয় ও সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে তহবিলের পরিমাণ বাড়ান।
জরুরি সঞ্চয় দৈনন্দিন খরচের টাকা থেকে আলাদা রাখলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। তবে অর্থ রাখার জায়গাটি যেন প্রয়োজনের সময় সহজে ব্যবহার করা যায়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
৫. বেতন হাতে পেয়েই সঞ্চয়ের টাকা সরিয়ে রাখুন
মাসের সব খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট অর্থ সঞ্চয় করার পরিকল্পনা অনেক সময় সফল হয় না। কারণ প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটখাটো খরচে পুরো বেতনই শেষ হয়ে যেতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে বেতন পাওয়ার পরপরই সঞ্চয়ের জন্য নির্ধারিত অর্থ আলাদা করে রাখুন। এরপর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে মাসের অন্যান্য ব্যয় পরিচালনার পরিকল্পনা করুন। ব্যাংকের স্বয়ংক্রিয় অর্থ স্থানান্তর সুবিধা থাকলে নির্দিষ্ট সময়ে সঞ্চয়ের টাকা সরিয়ে রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ‘খাম পদ্ধতি’ অনুসরণ করা যেতে পারে। মাসের শুরুতেই বাড়িভাড়া, বাজার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য আলাদা আলাদা খাতে টাকা ভাগ করে রাখুন। এতে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা যাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকবে। কোনো একটি খাতে বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে অন্য খাতের অর্থ ব্যবহারের আগে প্রয়োজনটি পুনর্বিবেচনা করা যাবে।
৬. ঋণের চাপ কমাতে আগাম পরিকল্পনা করুন
ঋণের কিস্তি ও সুদ অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করে। তাই ঋণ থাকলে কিস্তি পরিশোধের অর্থ বাজেটে শুরুতেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একাধিক ঋণ থাকলে বেশি সুদের ঋণ আগে পরিশোধের কৌশল নেওয়া যেতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে সুদের ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকে। তবে সব ঋণের ন্যূনতম বা নির্ধারিত কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করাও জরুরি, যাতে বিলম্বজনিত জরিমানা বা অতিরিক্ত চার্জ এড়ানো যায়।
নতুন ঋণ নেওয়ার আগে নিজের নিয়মিত আয়, পারিবারিক ব্যয় এবং বিদ্যমান কিস্তির হিসাব মিলিয়ে দেখুন। নতুন কিস্তি পরিশোধের পর খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য অপরিহার্য খরচ চালানোর মতো অর্থ থাকবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
৭. বাড়তি আয়ের সুযোগ কাজে লাগান
ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সাশ্রয় করা সম্ভব হলেও এর একটি সীমা রয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের আয়ের প্রায় পুরোটাই প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়ে যায়, তাঁদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস খুঁজে বের করা কার্যকর হতে পারে।
নিজের দক্ষতা ও সময় অনুযায়ী টিউশনি, লেখালেখি, অনুবাদ, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো কাজ বিবেচনা করা যায়। পাশাপাশি নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে ভালো বেতনের চাকরি বা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাড়তি আয়ের আশায় কোনো কাজে অর্থ বিনিয়োগ করার আগে সেটির বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের নিশ্চয়তা দেওয়া প্রস্তাব থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আয় বাড়ানোর উদ্যোগ যেন উল্টো আর্থিক ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
মাস শেষে হিসাব মিলিয়ে পরের মাসের পরিকল্পনা করুন
এক মাসের বাজেট পরবর্তী মাসেও একইভাবে কার্যকর থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারদর, পারিবারিক প্রয়োজন ও আয়ের পরিবর্তনের কারণে ব্যয়ের হিসাবেও সমন্বয় আনতে হতে পারে। তাই প্রতি মাসের শেষে মোট আয় ও ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখা উচিত।
কোন খাতে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি খরচ হয়েছে, কোথায় সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে এবং কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর ছিল—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে পরবর্তী মাসের বাজেট তৈরি করুন। কোনো মাসে সঞ্চয় কম হলে নিজের আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা সংশোধন করুন।
কম আয়ে স্বচ্ছন্দে মাস চালানোর জন্য কোনো একক সমাধান নেই। তবে ব্যয়ের হিসাব রাখা, প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নিয়মিত সঞ্চয়, ঋণের নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ কাজে লাগানোর মাধ্যমে আর্থিক চাপ ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের বাস্তব সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা এবং সেটি নিয়মিত অনুসরণ করা।



