tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাতে সাগরে নামছেন জেলেরা

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাতে সাগরে নামছেন জেলেরা

মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপকূলের হাজারো জেলে। দীর্ঘ বিরতির পর তাদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে পটুয়াখালীর অন্যতম মৎস্য বন্দর মহিপুর ও আলীপুর। তবে সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশের প্রাপ্তি, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং সংসারের ব্যয় মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তাও কাটছে না জেলেদের।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ ট্রলার মেরামত করছেন, কেউ জাল গুছিয়ে নিচ্ছেন। আবার কেউ ট্রলারে তুলছেন বরফ, জ্বালানি তেল ও মাছ ধরার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা ট্রলারগুলো প্রস্তুত রয়েছে মধ্যরাতের অপেক্ষায়।

জেলেরা জানান, ভরা মৌসুমেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এর ওপর টানা ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারও বন্ধ ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্য এবং এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এবার সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই নতুন করে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

সরকারি সহায়তা নিয়ে জেলেদের অভিযোগ

নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক জেলে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ও নিবন্ধিত জেলেদের একটি অংশ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৮ হাজার ৩০৫ জন নিবন্ধিত জেলেকে নিষেধাজ্ঞাকালীন ২৫ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ অভিযান পরিচালনা করেছে। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞাকালে জেলাজুড়ে ৪৮৪টি বিশেষ অভিযান ও ১২৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ১৪৮ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১৬৭টি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩ লাখ ১১ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি প্রায় ২০ লাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে।

ইলিশের প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা

স্থানীয় জেলেদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, সমুদ্রে চর জেগে ওঠা এবং মোহনায় নাব্যসংকটের কারণে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে এবার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে তাদের মধ্যে।

মহিপুরের জেলে আলতার বলেন, “ভরা মৌসুমে ইলিশ কম পেয়েছি। নিষেধাজ্ঞার সময় বেকারত্বে দিন কেটেছে। বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে ২৫ কেজি চাল দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। এবার আবার সমুদ্রে যাব। আশা করি, অনেক ইলিশ ধরা পড়বে।”

আরেক জেলে মো. খলিল খান বলেন, “এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। মাছ না ধরলে কিস্তি দেওয়ার উপায় থাকে না। নিষেধাজ্ঞার সময়টা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের ছিল। এখন মধ্যরাত থেকেই সমুদ্রে নামব। আশা করি, আশানুরূপ ইলিশ পাব।”

মহিপুর মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা মিয়া বলেন, ২২ দিন ব্যবসা বন্ধ ছিল। জেলেরা সমুদ্রে নামলেই আবার কাজ শুরু হবে। এবার প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছেন তিনি। এতে জেলেদের আর্থিক কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে বলেও প্রত্যাশা তার।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, “মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমাদের ধারণা, সরকারের এই অবরোধ সফল হয়েছে। এখন জেলেরা গভীর সাগরে জাল ফেলতে পারলে আশা করছি, তাদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে এবং তারা পূর্বের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।”

উল্লেখ্য, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারা দেশে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাত থেকে সাগরে মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। এখন তাদের প্রত্যাশা, জালে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও কাটবে।