কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। উভয় দেশই এআইকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। ফলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ স্পষ্ট। দেশটি উন্নত এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে চীন প্রকাশ্যে তুলনামূলক কম সরব হলেও দীর্ঘদিন ধরে এআইকে জাতীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
চীনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের গবেষক রেবেকা আরচেসাতির মতে, বেইজিং এআইকে স্পষ্টভাবেই একটি কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তার ভাষ্য, চীন মনে করে এআইয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন এবং জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে প্রযুক্তিটিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফ্রন্টিয়ার মডেলে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
এআই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুই শক্তি হলেও কোন দেশ এগিয়ে, তা নির্ভর করছে সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ডের ওপর। তথাকথিত ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল’-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে রয়েছে।
অ্যানথ্রপিক, গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বেঞ্চমার্কে সবচেয়ে সক্ষম এআই মডেল তৈরি করেছে। তবে চীনের ডিপসিকও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত অগ্রগতি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিপসিকের একটি মডেল অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মডেলগুলোর কাছাকাছি সক্ষমতা দেখায়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ মডেল সামগ্রিক সক্ষমতায় প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বিপুল বিনিয়োগ। উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। একই সঙ্গে এআই কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি দেশটির শেয়ারবাজার ও অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
চিপ সংকটেও দ্রুত এগোচ্ছে চীন
চীনের এআই খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নত মাইক্রোচিপের সরবরাহ। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যাধুনিক মার্কিন চিপ সহজে সংগ্রহ করতে পারছে না। উন্নত এআই মডেল তৈরিতে এসব চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চিপ-সংকট সত্ত্বেও চীনে নিয়মিত নতুন এআই মডেল তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ‘ওপেন-ওয়েট মডেল’ তৈরিতে দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। এসব মডেল ব্যবহারকারীরা ডাউনলোড করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব মালিকানাধীন মডেলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেগুলো সাধারণত সাবস্ক্রিপশন বা নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়।
চীনের মুনশট এআইয়ের ‘কিমি কে৩’-এর মতো মডেল চীনসহ বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণ, এসব মডেলের সক্ষমতা উন্নত ফ্রন্টিয়ার মডেলের কাছাকাছি হলেও এগুলো তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক লিজি লির মতে, বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য শুধু সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল তৈরি করা নয়; বরং দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেয়, চীন সস্তা, উন্মুক্ত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য এআইয়ের মাধ্যমে বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ ও রোবোটিকসেও চীনের সুবিধা
এআই প্রযুক্তি পরিচালনা ও প্রশিক্ষণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রেও চীন তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে রেবেকা আরচেসাতি উল্লেখ করেছেন। তার মতে, চীনের এআই কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়ার সুবিধা পেয়ে থাকে।
রোবোটিকসের ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান শক্তিশালী। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের হিসাবে, চীনের কারখানাগুলোতে ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প রোবট প্রস্তুতকারক দেশগুলোর একটি।
হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদনেও চীনের বড় অগ্রগতি রয়েছে। চ্যাথাম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে চীন থেকে।
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার বিশ্লেষক লিয়ান জে সু বলেন, উন্নত মার্কিন চিপের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চীনের এআই নির্মাতারা উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
প্রযুক্তি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এআই প্রতিযোগিতায় ব্যবধান কমাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ডিস্টিলেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছে মার্কিন কর্মকর্তা ও কিছু এআই কোম্পানি। এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক উন্নত একটি এআই প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন মডেলের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের অভিযোগের জবাবে জানিয়েছে, দেশটির এআই উন্নয়ন ব্যাপক পরামর্শ ও অভিন্ন কল্যাণের জন্য যৌথ অবদানের নীতির ওপর পরিচালিত হচ্ছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়েও ভিন্ন অবস্থান
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। প্রযুক্তি খাতের কিছু বিশেষজ্ঞ এআইকে ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে চীনা গবেষকদের আলোচনায় এআইয়ের অপব্যবহার ও সাইবার যুদ্ধের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম বিধিনিষেধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন রয়েছে এবং এআইয়ের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প দাবি করেন, এআই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং এই অবস্থান ধরে রাখবে। তার মতে, শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি প্রযুক্তির বিকাশকে যুক্তরাষ্ট্রের দমিয়ে রাখা উচিত নয়।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান চেক পয়েন্ট সফটওয়্যার টেকনোলজিসের তথ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা জয়ন্ত ডেভের মতে, মার্কিন গবেষণাগারগুলোকে এগিয়ে রাখতে ওয়াশিংটন উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কমানোর দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এআইয়ের ঝুঁকির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি প্রযুক্তিটি যেন সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
ফলে এআই প্রতিযোগিতা এখন শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরি করতে পারে—এমন প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার, সাশ্রয়ীতা, চিপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, রোবোটিকস, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক প্রভাব—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।



