tanaka

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ফোন করলেই মিলছে ইলিশ, গলাচিপায় ১৮ স্থানে বেচাকেনা

মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও পটুয়াখালীর গলাচিপায় থেমে নেই ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। প্রশাসনের অভিযান এড়িয়ে উপজেলার অন্তত ১৮টি স্থানে চলছে ইলিশ কেনাবেচা।...
প্রচ্ছদসারাদেশনিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ফোন করলেই মিলছে ইলিশ, গলাচিপায় অন্তত ১৮ স্থানে বেচাকেনা

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ফোন করলেই মিলছে ইলিশ, গলাচিপায় অন্তত ১৮ স্থানে বেচাকেনা

মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও পটুয়াখালীর গলাচিপায় থেমে নেই ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। প্রশাসনের অভিযান এড়িয়ে উপজেলার অন্তত ১৮টি স্থানে চলছে ইলিশ কেনাবেচা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় দালাল ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেই মিলছে ইলিশ, তবে অপরিচিত ক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রিতে রয়েছে কড়াকড়ি।

রোববার সকালে ছদ্মবেশে ইলিশের ক্রেতা সেজে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মন্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। ইলিশের কথা বলতেই প্রথমে নিজের নাম-পরিচয় জানতে চান তিনি। পরে ক্রেতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করতে বলেন।

একই এলাকার বাসিন্দা মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কয়েক দফায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ইলিশের দাম জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম দেড় হাজার টাকা। এক কেজির কম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ছোট আকারের মাছের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা।

তবে সরাসরি মাছ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান মিজান। তিনি জানান, চরকাজল এলাকায় তাঁর ওয়ার্কশপে টাকা রেখে গেলে সেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ পৌঁছে দেওয়া হবে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রোববার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ শিকার ও বিক্রি চলছে। এসব কার্যক্রমে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অন্তত ১৮ স্থানে ইলিশ বেচাকেনার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গলাচিপার চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা এলাকায় ইলিশ বেচাকেনা চলছে।

এ ছাড়া রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট, সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বোয়ালিয়া স্লুইসগেট, পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লোন্দা স্লুইসগেট এবং গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ফোনে অর্ডার দিলেই ব্যাগে করে পৌঁছে দেওয়া হয় ইলিশ। তবে অপরিচিত ক্রেতাদের কাছে মাছ বিক্রি করতে চান না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফলে পুরো বেচাকেনা প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছেন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যরা বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযান চললেও থামছে না শিকার

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদী ও সাগরে মাছ শিকার করা হচ্ছে। প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও দুর্গম এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

অভিযোগ রয়েছে, চরবিশ্বাস ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে জেলেদের একটি সংঘবদ্ধ দল প্রশাসনের ট্রলারকে ধাওয়া করার চেষ্টা করে। একদিকে প্রশাসনের অভিযান চললেও অন্যদিকে ইলিশ শিকার অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ছাড়া গলাচিপা পৌরসভাসংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেঁতুলিয়া পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেঁতুলিয়া পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাটসংলগ্ন আগুনমুখা মোহনায় রাতের আঁধারে জাল ফেলার অভিযোগ রয়েছে জেলেদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনের ট্রলার দেখলেই সংশ্লিষ্ট জেলেরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কেউ কেউ বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে আশ্রয় নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান অনেকে। এমনকি মাছ শিকারের পর নৌকা বা মাছের কাছে মুঠোফোন নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

১১ দিনে ৩৪ অভিযান, জব্দ বিপুল পরিমাণ জাল ও ইলিশ

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনে উপজেলায় ৩৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় বিপুল পরিমাণ অবৈধ জালও জব্দ করা হয়। জব্দ করা জালের পরিমাণ ও বাজারমূল্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যে অসংগতি থাকায় তা যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

দুর্গম এলাকায় অভিযান চালাতে হচ্ছে: মৎস্য কর্মকর্তা

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “মৎস্য কার্যালয়সহ সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় অনেক সময় দ্রুত সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবে সেসব এলাকাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে।”

অভিযান পরিচালনাকারীদের ওপর জেলেদের হামলার চেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “চরবিশ্বাসের নোমোর স্লুইস এলাকা এমনিতেই দুর্গম। সেখানে অভিযান চলাকালে ওই এলাকার সংঘবদ্ধ একটি চক্র আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।”

সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে স্থানীয় প্রশাসনের আরও বক্তব্য প্রয়োজন।