tanaka
প্রচ্ছদসর্বশেষ সংবাদঅর্থনীতিআইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বৈঠক শেষ, সংকটের মুখে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্তি কী?

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বৈঠক শেষ, সংকটের মুখে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্তি কী?

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত, ঋণের বাড়তি ব্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক। তবে এসব বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা বা কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি সংস্থা দুটি। বৈঠকে বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি কমানো, অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অথচ বৈশ্বিক সংকট ও উন্নত দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপও। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বাজেটের ভারসাম্যহীনতার জন্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোই বেশি দায়ী। গত কয়েক বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের পরিমাণ কমলেও অন্যান্য দেশে বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়েছে।

এক দশক আগের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে সরকারি রাজস্বের ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ঋণের এই বাড়তি বোঝা সামলাতে গিয়ে সরকারগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এআই নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাড়ছে উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এবং এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবও বৈঠকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন জর্জিয়েভা। তাঁর ভাষ্য, এ বিষয়ে উত্তর পাওয়ার চেয়ে প্রশ্নই বেশি। সব সমস্যার সমাধান জানা আছে বলে যারা দাবি করছেন, তাঁদের বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করার পরামর্শও দেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সামলাতেই ব্যস্ত। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাড়তি সহায়তা, ঋণের চাপ কমানো এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।

কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী মরিসিও কার্দেনাস বলেন, বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তা মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে অবনতি

বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বড় ধরনের জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে সামলেছে। তবে বৈশ্বিক মন্দা এড়ানো সম্ভব হলেও উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুর্বল হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এই অর্থনীতিবিদের তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পারলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ কেট পিকেট নীতিনির্ধারকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বৈষম্য ও দারিদ্র্য বাড়তে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সংকট মোকাবিলার ব্যয়ও বাড়বে। শুধু অর্থনীতির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না, সেই সক্ষমতার সুফলও সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

উন্নয়ন সহায়তা কমছে, চ্যালেঞ্জ বাড়ছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব দেশের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকটের চিত্র উঠে এলেও সেগুলো মোকাবিলায় নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগের স্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ঋণের বাড়তি বোঝা, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বৈষম্য এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপ সামলাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স