tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ-সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০; আহত ১৫০ পুলিশ সদস্য

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ-সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০; আহত ১৫০ পুলিশ সদস্য

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতা। শনিবার (১৭ অক্টোবর) আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশটির বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে লিমোজ শহরের ১৪৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক টাউন হল আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১৫০ সদস্য।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে কিছু ‘সুযোগসন্ধানী অপরাধী’ ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও সরকার জরুরি অবস্থা জারির পরিকল্পনা করছে না বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর লিমোজে ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ভবনটির ছাদ ধসে পড়তে দেখা যায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্সেইতে কালো পোশাক পরা বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে ঢুকে ভাঙচুর চালান। অন্যদিকে লিওঁতে শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। লিমোজের ১৪৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ভবনটির ক্ষয়ক্ষতিকে ঐতিহ্যের জন্য ‘বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজধানী প্যারিসেও বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় শুরু হওয়া মিছিলে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কিছু বিক্ষোভকারী আতশবাজি ও পাথর ছুড়তে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় একটি ব্যাংকে হামলা এবং একটি ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। একটি ট্রাকে আগুন লাগার পর তা পাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। বুলভার ম্যাজেন্তা সড়ক এলাকায় কয়েক ডজন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। গ্যালারি লাফায়েত ডিপার্টমেন্ট স্টোরে প্রবেশের চেষ্টা, ব্যাংক ভাঙচুর এবং লাকোস্তের দোকানসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।

কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া আশপাশের ভবনের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জানালা ও দরজা বন্ধ রাখতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বানের পর শনিবারের বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। গত মাসে প্যারিসের দরিদ্র উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোর বিভিন্ন স্কুলে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও পরে তা বৈষম্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং জনসেবার মান নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।

এবারের আন্দোলনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেনশনভোগী ও কৃষকদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মজুরি ও পেনশন বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে ফরাসি জনগণের উদ্বেগও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ। অক্টোবরে দুই হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভ-মিছিলে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।

এদিকে দেশটির উগ্র বাম ও উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোও এই আন্দোলনকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। উগ্র বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবুভের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের লুটপাট থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্দোলনের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।