tanaka

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমতে পারে ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংস্কারের তাগিদ

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের প্রভাবে চাপে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা ও দারিদ্র্য কমাতে...
প্রচ্ছদজাতীয়ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমতে পারে ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংস্কারের তাগিদ

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমতে পারে ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংস্কারের তাগিদ

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের প্রভাবে চাপে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা ও দারিদ্র্য কমাতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারের ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের তৈরি করা সংকট নয়। একইভাবে আগের সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া অনিয়মের দায়ও বর্তমান সরকারের নয়। তবে এসব সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমানোর প্রত্যাশা

দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন মূল্যায়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন।

ড. তিতুমীরের দাবি, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তাঁর মতে, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া এবং নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনেও অতীতে ত্রুটি ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অনেকে তালিকার বাইরে ছিলেন, আবার যোগ্য নন এমন ব্যক্তিরাও তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এ সমস্যা কমাতে ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহার করে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচি এবং পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে এগুলোর সুফল নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতার ওপর।

জ্বালানি ব্যয় ও কৃষকের চাপ কমানোর উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এতে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

ড. তিতুমীর বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধির চাপ যাতে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যথাসম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের মধ্যেও কৃষকের ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে: উপদেষ্টা

অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, অতীতে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি ও অনিয়মের কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এতে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

উপদেষ্টার মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়লে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়া সহজ হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্য সংস্কারও প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো অগ্রাধিকার

ব্যাংকিং খাতের সংকটকে অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন ড. তিতুমীর। তাঁর দাবি, আগের সরকারের আমলে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের কারণে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বন্ধ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। পাশাপাশি অনেকে অর্থ জমাও রাখছেন, যা আস্থা ফেরার ইঙ্গিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাকেও তিনি আর্থিক খাতের পরিবর্তনের ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেন।

ড. তিতুমীর বলেন, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা অর্জন করা যায় না; কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হয়। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের ফলাফল দিয়েই আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সংস্কারের ওপর জোর

আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। অতীতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বর্তমান সরকার সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে চায়।

তাঁর মতে, রাজস্ব খাতের সংস্কার, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খাত সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ড. তিতুমীর বলেন, সরকার বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে শুক্রবার সকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। <Cite refs={[“turn925550search0″,”turn925550search2”]}/>

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।