৯ মাসে ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার, হয়রানির শিকার ৫১৮ সাংবাদিক
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন। এ ছাড়া কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ বন্দি। নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, ২৮৮টি পৃথক ঘটনায় নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫১৮ সাংবাদিক।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন ৪০১ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশ বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দলীয় সংঘর্ষ
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের বড় অংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলটির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৪২টি ঘটনায় ২ হাজার ৬৩২ জন আহত এবং ৪০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৩২১টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৯০ জন, নিহত হয়েছেন ১১ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের ৯৩টি সংঘর্ষে ৫৪৫ জন আহত ও ৯ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির ৪৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে পাঁচটি সংঘর্ষে ৫৮ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-জামায়াতের দুটি সংঘর্ষে তিনজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন। অন্যান্য ছোট-বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৭৪টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪০৫ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, মোট রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় ৯১ শতাংশ, অর্থাৎ ৯৩১টি ঘটনা ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলটির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে।
নির্বাচন ঘিরে ৪০২ সহিংসতার ঘটনায় নিহত ১৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয় মাসে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৬২৩ জন আহত এবং ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে ও পরে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এই সময় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১২৩টি ঘটনায় ৯৪১ জন আহত এবং আটজন নিহত হন। অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ২৩৪টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩৮ জন এবং নিহত হয়েছেন চারজন।
সংখ্যালঘুদের ওপর ৫৬ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বসতবাড়ি
নয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা এবং ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ধর্ষণের শিকার ৬৫৭ নারী ও কন্যাশিশু
প্রতিবেদনে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতার চিত্রও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের শিকারদের ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ ছাড়া ১৩০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ৫১৮ সাংবাদিক
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, নয় মাসে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। এ সময়ে ২০ সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বছরের প্রথম নয় মাসে কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি মনে করেন, মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।



