লালবাগ সার্কেলের এক সার্ভেয়ারকে ঘুস গ্রহণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর এবার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী। তাঁর মতে, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে শুধু ছোট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে চলবে না, চক্রের ওপরের স্তরে থাকা প্রভাবশালীদেরও গ্রেফতার করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সার্ভেয়ার গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
পোস্টে মুনীর চৌধুরী উল্লেখ করেন, রাজধানীর লালবাগ সার্কেলের ওই সার্ভেয়ারকে লাখ টাকা ঘুস গ্রহণের সময় গ্রেফতার করেছে দুদক। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ঘুস হিসেবে ৮০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ ছিল। দুদক আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই তাঁকে আটক করেছে বলে জানান তিনি।
তবে এ ঘটনায় প্রভাবশালী মহলের তদবির ও চাপ আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সাবেক এই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দুদকের জালে বড় দুর্নীতিবাজরা অনেক সময় ধরা পড়েন না; বরং ছোট পর্যায়ের কর্মকর্তারাই বেশি আটকের শিকার হন। এ ধরনের বৈষম্য দূর করতে তাঁদের সময়ে কাস্টমস কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক (ডিসি), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি), প্রধান প্রকৌশলী, পরিচালক, বিসিএস ক্যাডার এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
ভূমি খাতের দুর্নীতির কাঠামো তুলে ধরে মুনীর চৌধুরী বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই এক শ্রেণির তরুণ কর্মকর্তা দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েন। এ খাতে অবৈধ অর্থের একটি চক্রাকার প্রবাহ রয়েছে। এর একাংশ ব্যক্তিগত ভোগবিলাস ও গোপন সঞ্চয়ে ব্যয় হয়, অন্য অংশ যায় ঊর্ধ্বতন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের কমিশন, উপঢৌকন ও আপ্যায়নের পেছনে। এভাবেই বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতির একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
তাঁর অভিযোগ, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা এই চক্র ভাঙতে চাননি, কিংবা তা করতে সক্ষম হননি। ভূমি অফিসের অনিয়ম বন্ধে গোপনে ছদ্মবেশে পরিদর্শনের চেয়ে প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুনীর চৌধুরী জানান, একসময় তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী তাঁকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়ে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে তিনি সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। কারণ, একটি মোবাইল কোর্ট অভিযানে মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠানকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
ভূমি খাতের দুর্নীতির শিকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন সাবেক এই দুদক মহাপরিচালক। তিনি বলেন, যাঁরা নিজেদের জমি আবাসন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কিংবা জীবিকার কাজে ব্যবহার করতে চান, তাঁদের কাছ থেকে ঘুস আদায় করে এক শ্রেণির কর্মকর্তা অবৈধভাবে প্লট, ফ্ল্যাট ও ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে তুলছেন।
ঘুসের কারণে ভূমি মালিকদের যে ভোগান্তি ও মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপলব্ধি করেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো আমলার জেলা বা মফস্বল সফরের আপ্যায়ন ও উপঢৌকনের খরচ বহন করতে বাধ্য করা হতো এসিল্যান্ড কার্যালয়কে। এতে একদিকে কিছু কর্মকর্তা চাকরি হারানোর ভয়ে অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ প্রলোভনে পড়ে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। তবে নিজের চাকরিজীবনে এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এমন বহু অন্যায় দাবি সাহসের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও জানান তিনি।
এসিল্যান্ডদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় মুনীর চৌধুরী সততা ও নৈতিকতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী; একদিন সবাইকে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যেতে হবে। অসৎ হলে পাপের বোঝা নিয়ে এবং সৎ থাকলে মানুষের দোয়া নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে। তাঁর মতে, এসিল্যান্ডদের প্রশিক্ষণে আইন ও বিধিবিধান শেখানো হলেও মানবিকতা, আদর্শ ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
পোস্টের শেষাংশে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতি দুর্নীতির শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানান সাবেক এই মহাপরিচালক। তিনি বলেন, বিচারিক নীতি অনুসরণ করে সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশেষ ক্যাডার বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
লালবাগে গ্রেফতার হওয়া সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে সার্ভেয়ারের পরবর্তী ধাপে থাকা প্রভাবশালী ‘রুই-কাতলা’দেরও আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান মুনীর চৌধুরী।
লেখক: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক মহাপরিচালক।



