tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্পর্ক এগিয়ে যায়, নির্ভরতার মাধ্যমে নয়: ইইউ রাষ্ট্রদূত

সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্পর্ক এগিয়ে যায়, নির্ভরতার মাধ্যমে নয়: ইইউ রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক সহযোগিতা, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেছেন, টেকসই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ভরতার ভিত্তিতে নয়, বরং সহযোগিতা, জোট ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর গড়ে ওঠে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফইএস) বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের তৃতীয় পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

আলোচনায় বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক, একাডেমিক সহযোগিতা, তরুণদের সম্পৃক্ততা, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এফইএস বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেদেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, সভাপতি জিল্লুর রহমান এবং এফইএস বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাধন কুমার দাসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. ফেলিক্স গ্রেদেস সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংহতির প্রতি এফইএসের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংলাপ, গবেষণা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।

দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ন্যায়বিচারে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমান বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থবহ সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞান হস্তান্তরের জায়গা নয়; এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে চিন্তাকে প্রশ্ন করা হয়, দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত হয় এবং তরুণরা আন্তঃসংযুক্ত বিশ্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে কূটনীতি শুধু সরকারি দপ্তর, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা বন্ধ দরজার বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও মানবাধিকারের মতো বৈশ্বিক বিষয় সরাসরি তরুণদের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। তাই শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা, মতবিনিময় করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেক সময় সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সেই দূরত্ব কমিয়ে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও বন্ধ দরজার বৈঠকের বাইরে কূটনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসাই এ সিরিজের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ করে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার সিজিএস ও এফইএস বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগকে স্বাগত জানান। ইইউতে তিন দশকের কর্মঅভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতি ও ইউরোপ-দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করা জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, চলমান সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও জটিল হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর সংলাপের বিকল্প নেই। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখ করে তিনি সম্মিলিত উদ্যোগ ও টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মাইকেল মিলার বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং উন্মুক্ত নাগরিক পরিসর নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই পক্ষের অংশীদারত্ব ক্রমেই আরও কৌশলগত ও রাজনৈতিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ন্যায্য ও উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইইউর সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আগ্রহের কথাও জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য ইইউর সহায়তার কথা তুলে ধরেন। সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত মনোযোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সবুজ রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পরিবর্তনকালীন সময়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো রূপান্তর ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সময়, ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাণিজ্য, জলবায়ু কার্যক্রম, অভিবাসন, শিক্ষা, বৈশ্বিক অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মতবিনিময় করেন শিক্ষার্থীরা।